
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও চিত্রকলার অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নাম তরুণ ঘোষ আর নেই। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্প নির্দেশক ও প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল দিবাগত রাতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৩ বছর।
পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অ্যাজমাজনিত জটিলতা থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাঁকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
শৈশব, শিক্ষা ও কর্মজীবনঃ
১৯৫৩ সালের নভেম্বরে রাজবাড়ী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তরুণ ঘোষ। শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৭৭ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ভারতের বরোদার মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। ১৯৭৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে যোগ দিয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন শেষে ২০১২ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
চলচ্চিত্রে অবদানঃ
চিত্রকলার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনায়ও তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। কিত্তনখোলা চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
এছাড়া মাটির ময়না, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “নরসুন্দর”, এবং চন্দ্রাবতী কথা-সহ বহু চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর সর্বশেষ কাজ ছিল মুক্তিপ্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র “সখী রঙ্গমালা”।
চিত্রশিল্পী হিসেবে স্বীকৃতিঃ
তরুণ ঘোষ শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, চিত্রশিল্পেও সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ‘বেহুলা’ সিরিজ শিল্পবোদ্ধাদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং এর জন্য তিনি এশিয়ান আর্ট অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তাঁর শিল্পকর্মে বাংলার লোকঐতিহ্য, মিথ ও মানবিক অনুভবের গভীর প্রকাশ লক্ষ করা যায়।
ব্যক্তিজীবন ও শোকঃ
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী ও এক পুত্রসন্তান রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহকর্মী, শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম।
শেষ কথাঃ
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নান্দনিক ভাষা নির্মাণে এবং চিত্রকলার জগতে তরুণ ঘোষের অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে দেশ হারালো এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পযোদ্ধাকে, যার সৃষ্টিকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখায়।