ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহানায়ক উত্তম কুমার এক অবিস্মরণীয়, বিস্ময়কর প্রতিভাবান ও বিরল শিল্পী৷ প্রায় তিন দশকের অভিনয়জীবনে তিনি যে জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং শিল্পীসত্তার পরিচয় রেখে গেছেন, তা বাংলা সিনেমায় আজও এক অনন্য মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। জন্মের একশ বছর পরও তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং চলচ্চিত্রচর্চা সমান আগ্রহ নিয়ে আলোচিত হয়।
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে তাঁর জন্ম। পরবর্তীকালে তিনি হয়ে ওঠেন মহানায়ক উত্তম কুমার। এই পরিচয় বা সম্মান তিনি কোনো দিন সহজে পাননি। অভিনয়জীবনের শুরুতে তাঁকে একের পর এক ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। নিজের ওপর আস্থা, কঠোর পরিশ্রম এবং অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে ধীরে ধীরে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যেখানে দর্শকের ভালোবাসাই তাঁকে ‘মহানায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর জীবন তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়, অধ্যবসায়েরও এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
উত্তম কুমারের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর স্বাভাবিকতা। তিনি সংলাপ বলতেন খুব সহজভাবে, যেন চরিত্রের ভেতর থেকেই কথাগুলো বেরিয়ে আসছে। চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি কিংবা নীরবতার মধ্য দিয়েও তিনি চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন। তাঁর অভিনয়ে কখনো বাড়াবাড়ি ছিল না, কৃত্রিমতাও ছিল না। এ কারণেই তাঁর অভিনয় আজও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।
বাংলা চলচ্চিত্রে রোমান্টিক নায়কের যে জনপ্রিয় রূপ, তা অনেকটাই গড়ে উঠেছে উত্তম কুমারের হাত ধরে। বিশেষ করে সুচিত্রা সেন–এর সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়। তাঁদের অভিনয়ে প্রেম ছিল আন্তরিক, সংযত এবং বিশ্বাসযোগ্য। পর্দার সেই রসায়ন সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
তবে উত্তম কুমারকে শুধু রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়জীবনের পূর্ণ মূল্যায়ন করা হবে না। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র, সামাজিক গল্প, পারিবারিক কাহিনি কিংবা মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র—সব ধরনের ভূমিকাতেই তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিটি চরিত্রে তিনি আলাদা স্বর ও আলাদা ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে পারতেন। সেই কারণেই তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আজও দর্শকের মনে রয়ে গেছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ ছিল। প্রযোজনা ও পরিচালনার কাজেও তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন আন্তরিকতার সঙ্গে। ভালো গল্প নির্বাচন, নির্মাণের মান এবং শিল্পগুণের প্রতি তাঁর সচেতনতা বাংলা চলচ্চিত্রকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বাণিজ্যিক সাফল্য এবং শিল্পমান—দুটিকে একসঙ্গে ধরে রাখার যে চেষ্টা তিনি করেছিলেন, তা আজও অনুসরণযোগ্য।
জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও উত্তম কুমার কখনো দায়িত্ববোধ থেকে সরে যাননি। শুটিংয়ে সময়মতো উপস্থিত হওয়া, চরিত্রের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং সহশিল্পীদের সম্মান করা ছিল তাঁর স্বভাব। তাঁর এই পেশাদার মনোভাব সহকর্মীদের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। তিনি শুধু একজন বড় অভিনেতাই নন, একজন দায়িত্বশীল শিল্পীও ছিলেন।
চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে। কিন্তু উত্তম কুমারের আবেদন কমেনি। নতুন প্রজন্মও তাঁর চলচ্চিত্র দেখে মুগ্ধ হয়। কারণ, মানুষের আবেগ, সম্পর্ক এবং জীবনের যে সত্য তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, তা কখনো পুরোনো হয় না। তাই তাঁর অভিনয় আজও চলচ্চিত্রের শিক্ষার্থী, গবেষক এবং নির্মাতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
জন্মশতবর্ষে উত্তম কুমারকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়। তাঁর জীবন ও কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন শিল্পীকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখে তাঁর নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং মানুষের ভালোবাসা। জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে কমে যেতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর মূল্য কখনো ফুরিয়ে যায় না।
একশ বছর পরও উত্তম কুমারের নাম একই রকম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর স্থান স্বতন্ত্র, তাঁর অবদান অনন্য। তিনি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন এক শিল্পী, যিনি সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের গুরুত্ব অটুট রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও রেখে যাবেন। তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক অবিনশ্বর প্রতীক। এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা৷
প্রকাশক / সম্পাদকঃ মো. জাকির হোসেন (মিথুন)
Phone No. : 01755-416262
E-mail: sotterdorpon24@gmail.com
Office: 44/1, Family Shamsher vally, Mugda Bissoroad, Dhaka, 1214.