চলচ্চিত্র সাংবাদিকঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি - বাংলাদেশের মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক এবং চলচ্চিত্রে শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য যেসব শিল্পী ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন Humayun Faridi। তিনি ছিলেন একাধারে মঞ্চ অভিনেতা, টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয় শিল্পী এবং চলচ্চিত্রের শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা। তাঁর অভিনয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর কণ্ঠস্বর, শক্তিশালী সংলাপ বলার ক্ষমতা এবং জটিল চরিত্রকে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা। প্রায় চার দশকের কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। জন্ম ও শৈশবঃ হুমায়ূন ফরিদি ১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকার নারিন্দা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল হুমায়ূন কামরুল ইসলাম। তাঁর পিতা এ. টি. এম. ইউসুফ এবং মাতা ফিরোজা বেগম। শৈশব ও কৈশোরের একটি সময় তিনি মাদারীপুরে কাটান। ছাত্রজীবনে তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা পরবর্তীতে তাঁর অভিনয়জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি প্রথমে University of Dhaka-এ অর্গানিক কেমিস্ট্রি বিষয়ে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কারণে তাঁর পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হয়। পরে তিনি Jahangirnagar University-এ অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়ন করেন এবং এই সময় থেকেই নাট্যচর্চার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। নাট্যজীবনের সূচনাঃ হুমায়ূন ফরিদির অভিনয়জীবন শুরু হয় মঞ্চনাটকের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বিখ্যাত নাট্যদল Dhaka Theatre-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এই নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নাট্যকার Selim Al Deen-এর নির্দেশনায় কাজ করার সুযোগ পান। তাঁর অভিনীত প্রথম দিকের মঞ্চনাটকের মধ্যে অন্যতম ছিল “শকুন্তলা”, যেখানে তিনি “তক্ষক” চরিত্রে অভিনয় করেন। এই নাটকের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় প্রতিভা প্রথমবারের মতো নাট্যাঙ্গনে পরিচিতি পায়। টেলিভিশন নাটকে উত্থানঃ বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকের মাধ্যমে হুমায়ূন ফরিদি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর টেলিভিশন নাটকে অভিষেক ঘটে “নীল নকশার সন্ধানে” নাটকের মাধ্যমে।
পরবর্তীতে তিনি অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেন এবং বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পান ধারাবাহিক নাটক সংসপ্তক-এ “কানকাটা রমজান” চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এই চরিত্রটি বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে বিবেচিত। তিনি আরও বহু জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করেন, যেমন—মন্টাসির ফ্যান্টাসি, বাকুলপুর কত দূর, ভাবের হাট, চন্দ্রগ্রস্ত। এই নাটকগুলোতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। চলচ্চিত্রে অভিনয়ঃ মঞ্চ ও টেলিভিশনের পাশাপাশি হুমায়ূন ফরিদি চলচ্চিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রথম দিকের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ছিল দিন-মজুর। পরবর্তীতে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এবং শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—পদ্মা নদীর মাঝি, আনন্দ অশ্রু, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, জয়যাত্রা, শ্যামল ছায়া, মাতৃত্ব, আহা, ব্যাচেলর প্রভৃতি৷ এই চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি কখনও ভিলেন, কখনও শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা হিসেবে অভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং নাটকীয়তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত। পুরস্কার ও সম্মাননাঃ হুমায়ূন ফরিদি তাঁর অভিনয়জীবনে বহু পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করেন।
২০০৪ সালে চলচ্চিত্র Matritto-তে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-এ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে ২০১৮ সালে। ব্যক্তিজীবনঃ ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ূন ফরিদি প্রথমে মিনু নামের একজনকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যার নাম দেবযানী। পরে তিনি জনপ্রিয় অভিনেত্রী Suborna Mustafa-কে বিয়ে করেন। ২০০৮ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। মৃত্যুঃ ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নিজ বাসভবনে হুমায়ূন ফরিদি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে।
মূল্যায়নঃ হুমায়ূন ফরিদি বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক এবং চলচ্চিত্র—এই তিন মাধ্যমেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, সংলাপের শক্তি এবং বাস্তবতা দর্শকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের নাট্য ও চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনি একজন কিংবদন্তি অভিনেতা হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
প্রকাশক / সম্পাদকঃ মো. জাকির হোসেন (মিথুন)
Phone No. : 01755-416262
E-mail: sotterdorpon24@gmail.com
Office: 44/1, Family Shamsher vally, Mugda Bissoroad, Dhaka, 1214.