
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি– বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম শহীদুল ইসলাম খোকন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী (৪ এপ্রিল) আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এক কর্মমুখর, সংগ্রামী এবং দর্শকনন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাতার জীবন ও অবদানকে।
জন্ম, শৈশব ও চলচ্চিত্রে আগমনঃ শহীদুল ইসলাম খোকন ১৯৫৭ সালের ১৫ মে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই সংস্কৃতি ও শিল্পের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে, এবং ধীরে ধীরে তিনি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের একজন শক্তিশালী নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
চলচ্চিত্র জীবন ও সাফল্যঃ ১৯৮৫ সালে ‘রক্তের বন্দী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর প্রায় তিন দশকের ক্যারিয়ারে তিনি ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যার অধিকাংশই ছিল ব্যবসাসফল। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—রক্তের বন্দী (১৯৮৫), চাঁদনা ডাকু, লড়াকু, বজ্র মুষ্টি, ঘাতক, কমান্ডার, ম্যাডাম ফুলি, পাগলা ঘণ্টা, ভালোবাসা সেন্ট মার্টিন। এই চলচ্চিত্রগুলোতে অ্যাকশন, সামাজিক সংকট, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ-শহুরে বাস্তবতার মিশেল দেখা যায়। বিশেষ করে তাঁর ছবিতে শক্তিশালী ভিলেন চরিত্র এবং নাটকীয় সংঘাত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
নির্মাণশৈলী ও অবদানঃ শহীদুল ইসলাম খোকনের চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল বাণিজ্যিকতার মধ্যেও সামাজিক বার্তা তুলে ধরা। তিনি এমন সময় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, যখন ঢালিউডে অ্যাকশনধর্মী সিনেমার চাহিদা ছিল তুঙ্গে। তাঁর নির্মিত সিনেমাগুলো সাধারণ মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি সমাজের নানা অসঙ্গতি ও অপরাধচিত্রও তুলে ধরেছে। তিনি শুধু পরিচালকই নন—প্রযোজক ও অভিনেতা হিসেবেও কাজ করেছেন, যা তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচায়ক।
অসুস্থতা ও মৃত্যুঃ জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি জটিল স্নায়ুরোগ (মোটর নিউরন ডিজিজ/এএলএস)-এ আক্রান্ত হন এবং দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকার উত্তরায় একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক মহল থেকে তাঁকে স্মরণ করা হয় এক নিবেদিতপ্রাণ চলচ্চিত্রকার হিসেবে। উত্তরাধিকার ও মূল্যায়নঃ শহীদুল ইসলাম খোকন ছিলেন সেইসব নির্মাতাদের একজন, যারা ঢালিউডের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো আজও দর্শকদের কাছে নস্টালজিয়ার অংশ এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সহকর্মীদের মতে, তিনি ছিলেন “সুপারহিট সিনেমার নির্মাতা” এবং একজন দূরদর্শী সংগঠক, যিনি চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
শেষ কথাঃ শহীদুল ইসলাম খোকনের মৃত্যুবার্ষিকী শুধু একজন নির্মাতাকে স্মরণ করার দিন নয়, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক স্বর্ণালী অধ্যায়কে পুনরায় ফিরে দেখার উপলক্ষ। তাঁর কর্ম, সৃজনশীলতা এবং দর্শকপ্রিয়তা নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।