
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের এক নীরব নির্মাতা ও প্রতিভাবান শিল্পী ছিলেন আলী কাওসার। তাঁর জন্মদিনকে ঘিরে যেমন স্মরণ করা হয় তাঁর সৃজনশীল অবদান, তেমনি তাঁর প্রয়াণদিনেও ফিরে দেখা হয় এক নিবেদিতপ্রাণ চলচ্চিত্রকর্মীর জীবনসংগ্রাম ও শিল্পচেতনা।
জন্ম ও শৈশবঃ
আলী কাওসারের জন্ম ৯ নভেম্বর ১৯৪৩ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। শৈশব থেকেই তিনি সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যা পরবর্তীতে তাঁর শিল্পীজীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
নাট্যমঞ্চ থেকে যাত্রাঃ
পঞ্চাশের দশকে তিনি ঢাকায় এসে মঞ্চনাটকের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। রাজধানীর নাট্যচর্চার পরিমণ্ডলে তিনি দ্রুতই নিজের অবস্থান তৈরি করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক লেখা ও নির্দেশনায়ও তিনি দক্ষতা দেখান।
এই সময়ে তাঁর বড় ভাই আলী মনসুর ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যার প্রভাব ও সহায়তায় আলী কাওসার নাট্যাঙ্গনে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হন। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন–এর নাটকেও অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
চচ্চিত্রে অবদানঃ
নাট্যমঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে এসে আলী কাওসার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবে। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো—মহুয়া,অনেক দিনের চেনা, রাজা সন্ন্যাসী, জানাজানি, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, গাঁয়ের বধূ, মানুষের মন, রংবাজ, বধূ মাতা কন্যা, ভাইবোন। এই চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক টানাপোড়েনকে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
পরিচালক হিসেবে পরিচিতিঃ
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনাতেও নিজস্ব স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো—গাঁয়ের বধূ, বধূ মাতা কন্যা, ভাইবোন। এই চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি সমাজের বাস্তবতা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলো তুলে ধরেছেন।
শিল্পভাবনা ও মূল্যায়নঃ
আলী কাওসার ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি আলোচনার কেন্দ্রে না থেকেও নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে ছিল বাস্তবধর্মিতা, আবেগ এবং সমাজমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি। সত্তর ও আশির দশকের চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান বাংলা সিনেমার ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।
প্রয়াণঃ
২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল রাজধানীর মাতুয়াইলে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গন হারায় এক নিবেদিতপ্রাণ নির্মাতা ও অভিনেতাকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ
আলী কাওসার আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও জীবন্ত। নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীদের কাছে তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে থাকবেন।
তাঁর প্রয়াণবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা—শ্রদ্ধাঞ্জলি, আলী কাওসার।