
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: (২২ অক্টোবর ১৯২২ – ৩ জুন ১৯৯২) বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যেসব শিল্পী নীরবে নিভৃতে গভীরভাবে নিজেদের ছাপ রেখে গেছেন, বঙ্কিম ঘোষ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন প্রবীণ অভিনেতা, নাট্যব্যক্তিত্ব এবং বহুমাত্রিক চরিত্রাভিনয়ের জন্য পরিচিত শিল্পী। জন্ম ১৯২২ সালের ২২ অক্টোবর, ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় এবং প্রয়াণ ১৯৯২ সালের ৩ জুন।
বঙ্কিম ঘোষ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওরিয়েন্টাল সেমিনারি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৩৮ সালে সিটি কলেজ থেকে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে বক্সিংয়ে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তিনি টানা পাঁচ বছর বেঙ্গল বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে বিজয়ী হন, যা তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। ক্রীড়ার পাশাপাশি তিনি নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। গণনাট্য, আনন্দ ভারতী, রূপকার এবং আনন্দলোকের মতো বিভিন্ন নাট্যদলে তিনি অভিনয় করেন। ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়। তবে এই পথ সহজ ছিল না—পরিবারের বিরোধিতার কারণে তাঁকে একসময় বাড়ি ছাড়তে হয়। অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জীবিকার জন্য তাঁকে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকতে হয়। তিনি গ্রিন্ডলেজ অ্যান্ড কোম্পানি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এবং কলকাতা হাইকোর্টে চাকরি করেন। অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে থিয়েটার ও চাকরি—দুই পথই সমান্তরালভাবে চলেছিল তাঁর জীবনে।
১৯৪৮ সালে হেমেন গুপ্ত পরিচালিত “ভুলি নাই” চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন। এটি ছিল তাঁর প্রথম পর্দা উপস্থিতি, যদিও চরিত্রটি ছোট ছিল। এর প্রায় এক দশক পর ১৯৬১ সালে সুশীল ঘোষ পরিচালিত “দিল্লি থেকে কলকাতা” ছবিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেন। এই সময় থেকেই তিনি ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রে একজন নির্ভরযোগ্য সহ-অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তী চার দশকের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের বহু কিংবদন্তি পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেন, যেমন—তপন সিংহ, বিজয় বোস, পরিমল ঘোষ, নিরঞ্জন দে এবং ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর অভিনয় ছিল স্বাভাবিক, সংযত এবং চরিত্রভিত্তিক—যা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়। তিনি কখনও খলচরিত্রে, কখনও আবার হাস্যরসাত্মক ভূমিকায় অভিনয় করে নিজের বহুমুখিতা প্রমাণ করেছেন। উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষসহ বহু প্রখ্যাত অভিনেতার সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ছিল সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করা। তিনি “চারুলতা” (১৯৬৪) এবং “চিড়িয়াখানা” (১৯৬৭) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এই চলচ্চিত্রগুলোতে তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকর উপস্থিতি দর্শকদের মনে দাগ কেটে যায়।
বঙ্কিম ঘোষ দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—ভুলি নাই (১৯৪৮), দিল্লি থেকে কলকাতা (১৯৬১), গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), চারুলতা, অতিথি (১৯৬৫), চৌরঙ্গী, আকাশ কুসুম, আরোগ্য নিকেতন, পরিণীতা (১৯৬৯), বসন্ত বিলাপ, স্বয়ংসিদ্ধা (১৯৭৫), মণিহার, উত্তর পুরুষ, হীরের আংটি, বদনাম (১৯৯০) প্রভৃতি। এই তালিকা ছাড়াও তিনি আরও বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, যা বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে তাঁর অবদানকে আরও বিস্তৃত করে।
অভিনয় জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি শিশু অধিকার ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত হন। তিনি “জাতীয় সংঘ” নামের একটি শিশু কল্যাণ সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন। সমাজের প্রান্তিক শিশুদের কল্যাণে তাঁর এই ভূমিকা তাঁকে একজন মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।
বঙ্কিম ঘোষ তারকাখ্যাতির বাইরে শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য কাজ করেছেন। তিনি নায়ক ছিলেন না, কিন্তু প্রতিটি চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল বাস্তবতার এক নির্ভরযোগ্য ছাপ।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারণ করা হয় একজন নিখুঁত চরিত্রাভিনেতার প্রতীক হিসেবে। তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।