
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ ২ জুন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক রাজ কাপুর-এর মৃত্যুদিন। ১৯২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পেশোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল রণবীর রাজ কাপুর। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে তিনি এমন একজন অভিনেতা ও নির্মাতা, যিনি হিন্দি চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে তুলেছিলেন। রাজ কাপুর ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিখ্যাত কাপুর পরিবারের সদস্য। তাঁর বাবা ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব পৃথ্বীরাজ কাপুর, যিনি ভারতীয় থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতের পথিকৃৎ ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে স্বীকৃত এবং তাঁর দুই ভাই শাম্মী কাপুর ও শশী কাপুরও হিন্দি চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয়, সফল ও কিংবদন্তি অভিনেতা ছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাপুর পরিবারের ঐতিহ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজ কাপুরের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজ কাপুরকে প্রায়ই “দ্য গ্রেটেস্ট শোম্যান অব ইন্ডিয়ান সিনেমা” এবং “ইন্ডিয়ার চার্লি চ্যাপলিন” বলা হয়। তাঁর অভিনয়, নির্মাণশৈলী, সঙ্গীতবোধ এবং সামাজিক বক্তব্যসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র তাঁকে সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছেও অনন্য মর্যাদা এনে দিয়েছে।
মাত্র অল্প বয়সেই চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন রাজ কাপুর। ১৯৪৭ সালে নীল কমল চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত আর. কে. ফিল্মস, যা পরবর্তীকালে ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। একই বছর আগ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালনায়ও আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রাজ কাপুর নির্মাণ করেন একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্র। আওয়ারা, শ্রী ৪২০, জাগতে রহো, সঙ্গম, মেরা নাম জোকার, ববি, প্রেম রোগ এবং রাম তেরি গঙ্গা ম্যায়লি আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর চলচ্চিত্রে যেমন প্রেম ছিল, তেমনি ছিল সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, মানবিক সংকট এবং স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি।
বিশেষ করে আওয়ারা এবং শ্রী ৪২০ তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দর্শকদের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল বিস্ময়কর। চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করার ক্ষেত্রে রাজ কাপুরের অবদান অসামান্য।
রাজ কাপুরের সঙ্গে অভিনেত্রী নার্গিস-এর জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম কিংবদন্তি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁদের অভিনীত বহু চলচ্চিত্র আজও দর্শকের আবেগের অংশ হয়ে আছে।
শুধু অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেই নয়, নতুন প্রতিভা আবিষ্কার ও গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও রাজ কাপুরের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গীত পরিচালক শঙ্কর-জয়কিশান, গায়ক মুকেশ, গীতিকার শৈলেন্দ্রসহ অসংখ্য শিল্পীর ক্যারিয়ার গঠনে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের বিভিন্ন আলোচনায়ও তাঁর এই প্রতিভা-চর্চার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।
১৯৭১ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৮৮ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেন তিনি। একই বছরের ২ জুন তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র, চরিত্র এবং সঙ্গীত আজও সমানভাবে দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছে।
বর্তমান প্রজন্মেও তাঁর উত্তরাধিকার বহমান। কাপুর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম—ঋষি কাপুর, রণধীর কাপুর, রাজীব কাপুর, কারিশমা কাপুর, কারিনা কাপুর এবং রণবীর কাপুর—ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আর. কে. স্টুডিওর উত্তরাধিকার নতুনভাবে পুনর্জাগরণের উদ্যোগও আলোচনায় এসেছে।
মৃত্যুদিনে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই মহীরুহকে গভীর শ্রদ্ধা।