
এলাকার সেক্রেটারি : আওয়ামী লীগের এক ভণ্ড আধিপত্যবাজের কাহিনী
ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি- ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছাত্র হত্যা মামলার পলাতক আসামী মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার নিগুয়ারী ইউনিয়নের সাধুয়া গ্রামে। এই গ্রামের ঈদগাহ মাঠ ও মসজিদের পাশে পুরাতন একটি বড় দীঘি আছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে দীঘিটি এক সময় মসজিদের মুসুল্লিদের অযু ও এলাকাবাসীর নিত্যদিনের কাজে ব্যবহার করা হতো। গ্রামের সমস্ত মানুষের গোসল ও পাশ্ববর্তী বাড়িঘরের মা বোনেরা গৃহস্থালি কাজের পানির চাহিদা মেটাতেন এই দীঘি থেকে। দীঘিটা সরকারি খাসের জমি। ২০১১ সালের দিকে মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এলাকায় গিয়ে গ্রামবাসীকে ডেকে বলেন দীঘিটা গ্রামের সবার নামে কাগজ করে আনা হবে৷ মাছ চাষ করে সবাই টাকা উঠিয়ে নেয়া হলে পর মসজিদের নামে ওয়াকফ করা হবে। তাঁর কথা মত সবাই মিলে সেই সময়ে ৩ লক্ষ টাকা তাঁর হাতে তুলে দেন। গ্রামের দরিদ্র চাষাভুষা দিন মজুর মানুষ এরা। কেউ জমি বিক্রি করে টাকা দেন, কেউ সারাজীবনের দিনমজুরের কাজ করে জমানো টাকা তাঁর হাতে দেন। মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল দীঘিটি মসজিদের নামে ওয়াকফ ও জনস্বার্থে ব্যবহারের কথা বলে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে নিজের নামে কাগজ করেন ও দীঘিটি দখল করেন। দীঘির জায়গার পরিমাণ হবে প্রায় ৬০ কাটা পরিমাণ। দীঘিটি দখলের পর মাছ চাষের জন্য ভাড়া দেন। প্রতি বছর ৪-৫ লাখ টাকা ভাড়া নিয়েছে সে। এখনো সেটা বহাল আছে৷ এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে দীঘির চারপাশে প্রচুর গাছপালা ছিল। বড় একটি শান বাঁধানো মিম্বর করা পাকা ঘাট ছিল। দীঘির চারপাশের সমস্ত বড় বড় গাছপালা কেটে ফেলেন। দীঘিতে মসজিদের মুসুল্লিদের অজু ও এলাকাবাসীর গোসল ও নিত্যদিনের সমস্ত প্রকার ব্যবহার বন্ধ করেন। মিম্বরযুক্ত শান বাধানো বড় পাকা ঘাটটিও ভেঙে দেন।

এভাবেই নানান কৌশলে দীঘিটি দখল করে গ্রামের মানুষদের সাথে সে প্রতারণা করে। মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এলাকায় আসলে তাকে আপ্যায়নের সমস্ত প্রকার আয়োজন করতেন তাঁর আপন মামাতো ভাই ত্বকি উদ্দিন। ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ লাভের পর গ্রামের বাড়িতে গেলে ত্বকি উদ্দিন তাঁকে সমস্ত প্রকার আপ্যায়নের কাজ করার ফলে এলাকাবাসী ও আশেপাশের গ্রামের মানুষের কাছে সে মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর খুব কাছের লোক বলে পরিচিত পায়। সেই সুবাদে সে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। স্থানীয় বিচার সালিশে সে বিচারক বনে যায়। যে পক্ষ টাকা দিতো সে পক্ষের পক্ষে সে বিচারের রায় দিতো। মোয়াজ্জেমের নাম ভাঙিয়ে সে এমন পরিবেশ তৈরি করে তাঁর বাড়িতে প্রতিদিন এমবিবিএস ডাক্তারের মত বিভিন্ন কাজের জন্য লোকজন আসা যাওয়া শুরু করে। দালালি, চিটারি, বাটপারির ব্যবসা শুরু করে। মোয়াজ্জেমের নামে সে মামলা সমাধান বাবদ, বিভিন্ন তদবির বাবদ, বিচার সালিশের ফয়সালা বাবদ, আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটিতে পদ পদবী পাইয়ে দেয়াসহ বিভিন্ন কাজের কথা বলে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়ার বাণিজ্য করে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সে অঞ্চলে বছরে ৬ মাস ও বছর মেয়াদী মাছের চাষ হয়। সে মোয়াজ্জেমের নাম ভাঙিয়ে ঘুষের বিনিময়ে মানুষের চাষের জায়গা জমি মাছ চাষওয়ালাদেরকে পাইয়ে দিতো। সবাই আড়ালে প্রতিবাদ, কানাঘুষা করলেও ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস পেতো না। কারণ কেউ ত্বকি উদ্দিনের কথার বাইরে কোনো কাজ করলে, তাঁর কথার ও কাজের সাথে কারো কথা ও কাজ না মিললে তাঁর বাড়িতে পুলিশ তুলে দিয়ে হয়রানি করতো। এলাকায় সবকিছু তাঁর কথা মতোই চলতো। কে কি করবে না করবে সবকিছু তাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হতো। তাঁকে হাত না করে, না জানিয়ে কেউ কোনো কাজ করার নিয়ম ছিল না। মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এলাকায় এসে তাঁর ঘরে উঠতো, বসতো, খেতো বলে গ্রামের সবাইকে তাঁকে মান্য করতে হবে, তাঁর কথা মত চলতে হবে এটাই নিয়ম ছিল। মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর, এলাকায় ত্বকি উদ্দিন মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর কাছের মানুষ পরিচিতি পাবার পর সে ২০১৬ সালের দিকে গ্রামের মসজিদ কমিটি ভেঙে দেয়। মসজিদ কমিটি থেকে গ্রামের মুরুব্বি ও গন্যমান্য মানুষদের বের করে দিয়ে সে নিজের মত করে কমিটি বানিয়ে সাধারণ সম্পাদক পদ নেয়। মসজিদের সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে, এলাকায় মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর নামে বিশাল প্রভাব তৈরি করে তাঁর টাইটেল হয়ে যায় এলাকার সেক্রেটারি। অর্থাৎ এলাকায় কি হবে, না হবে, কে কি করবে, না করবে, কে কিভাবে চলবে, না চলবে সবকিছু তাঁর কথায় হবে। তাঁর কথার বাইরে কোনো কিছু হবে না। তাঁর মতের বাইরে কেউ কোনোকিছু করলে তাকে কোনো একটি প্যাঁচে ফেলে দিয়ে হয়রানি করতো, না হয় বাড়িতে পুলিশ তুলে দিতো। লোকটি লেবাসে একজন আওলিয়া, কিন্তু কাজে কর্মে কথাবার্তায় সম্পূর্ণ লেবাসধারী ভণ্ড, মিথ্যুক, গিরিঙিবাজ। সারা গ্রামে তাঁর গিরিঙিবাজিতে মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। এক সময় এলাকায় তাঁর নামের টাইটেলই হয়ে যায় কিসিঞ্জার, হিটলার, গিরিঙিবাজ। মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর নাম ভাঙিয়ে এমন কোনো অপকর্ম নেই যে সে সেটা করিনি। মসজিদের রিসিট দিয়ে মসজিদের উন্নয়ন কাজের কথা বলে সে লক্ষ লক্ষ টাকা মানুষদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়। স্থানীয় সূত্রে আরো জানা গেছে, সাধুয়ায় আবু সাঈদীয়া দাখিল মাদ্রাসা নামে একটি ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২৩-২৪ বছরে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ছিল সে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিল নিগুয়ারী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গফরগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ময়মনসিংহ ১০ আসনের হত্যা মামলার পলাতক আসামী সাবেক সংসদ সদস্য ফাহমী গোন্দাজ বাবেলের কাছের মানুষ সদ্য প্রয়াত কামরুল হুদা সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গত ২০২৩ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানে তাঁরা প্রায় ১৫-২০ লক্ষ টাকার ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অবৈধভাবে লোক নিয়োগ দেন। লোক নিয়োগ দিলে কয়েক মাস বেতন বন্ধ থাকায় উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে ঘুষ দিয়ে বেতন চালু করেন। প্রার্থীদের পক্ষে ঘুষ লেনদেন করেন আওয়ামী লীগের এলাকার সেক্রেটারি খ্যাত ত্বকি উদ্দিন৷ আওয়ামী লীগের দালালদের ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে এই অবৈধ নিয়োগে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক। দুর্নীতি দমন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এলাকায় সকল বিষয়ে সে মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুলের নামে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতো৷ সবকিছু তাঁর সুবিধামত হত। প্রতি বছর কোরবানি ঈদে মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল তাঁকে লাখ টাকার গরু উপহার দিতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপি নেতাদের কাছে জানা যায়, “তাঁর মত বাজে লোক এই অঞ্চলে নেই। তাঁর গিরিঙিবাজী ও দুই নম্বরি কার্যকলাপে এলাকার সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। এদের কারণে এলাকার বিএনপি ও জামাত শিবিরের নেতাকর্মীরা ১৭ বছর বাড়ি ঘরে থাকতে পারেনি। মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিতো, বাড়ি ঘরে পুলিশ তুলে দিত, পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিতো। কেউ কোনো ভালো কাজ করলেও সে গিরিঙিবাজি করে বাঁধা দিত। এলাকায় তাঁর উপরে কেউ কিছু করার ও বলার সংবিধান ছিল না। সে নিজেই আইন ও সংবিধান বানাতো। মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর নাম ভাঙিয়ে নিজের মত করে কথা বানিয়ে মানুষকে বলতো, যেন সবকিছু তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ত লোকের কারণে মানুষের শান্তি নষ্ট হয়। মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর দখল করা ৬০ কাটার দীঘিটা তাঁর তত্বাবধানেই মাছের চাষ হয়।” এমন কোনো সামাজিক ও মানবিক অপরাধ নেই যে মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর নাম ভাঙিয়ে সে করিনি। তাঁর অত্যাচারে, দালালি, চিটারি, বাটপারি, গিরিঙিবাজিতে মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। এলাকায় তাঁর বেশকিছু দালাল আছে, যারা তাঁকে সাপোর্ট দিতো। মামলা, পুলিশ ও মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর ক্ষমতার ভয়ে তাঁকে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস পেতো না। গফরগাঁওয়ে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও একাধিক হত্যা মামলার পলাতক আসামি মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল এর অন্যতম প্রধান সহযোগী, আওয়ামী লীগের দালাল, তাঁর মত সামাজিক ও মানবিক অপরাধী, কুলাঙ্গারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। গত বছর ৫ আগস্টে সরকার পতনের পরও সে এলাকায় থেকে যায়। কার আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে সে এখনো আইনের বাইরে—সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীদের দাবি। এলাকায় সে এখনো আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—তাঁকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। বাংলাদেশে আর যেন কোথাও “এলাকার সেক্রেটারি” নামে কোনো অপরাধীর জন্ম না হয়।
