
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বিনোদন সাংবাদিক::
আজ বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিকুল হক এর ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি সকলের কাছে দাদুভাই নামে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি একাধারে একজন ছড়াকার, সাংবাদিক, নাট্যকার, গীতিকার ও শিশু সংগঠক ছিলেন।
তিনি ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি ভারতের কুচবিহারে জন্মগ্রহন করেন। দেশভাগের পর তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে পূর্ব বঙ্গ তথা বাংলাদেশে চলে আসেন এবং রংপুরের সদরের কামাল কাছনায় বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতার নাম ইয়াসিন উদ্দিন আহম্মেদ এবং মাতার নাম রহিমা খাতুন।
তিনি ১৯৬০ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন এবং জুরিখের ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট থেকে সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ পাঁচ দশক সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬১-২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জেহাদ, সোনার বাংলা, দৈনিক পয়গাম, দৈনিক পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা, দৈনিক জনতা, বাংলাদেশ অবজারভার, আজাদ, লালসবুজ, দৈনিক রূপালী প্রভৃতি পত্রিকায় বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০০৪-২০২১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দৈনিক যুগান্তরের ফিচার এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি শিশু সংগঠক হিসেবে শিশু কিশোরদের জন্য প্রচুর কাজ করেছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন চাঁদের হাট প্রতিষ্ঠা করেন। উপমহাদেশে শিশু কিশোরদের প্রথম সংবাদপত্র কিশোর বাংলা তাঁর সম্পাদনায় ঢাকা থেকে দীর্ঘদিন প্রকাশিত হয়।
তিনি একজন স্বনামধন্য গীতিকার ও নাট্যকার ছিলেন। টেলিভিশন ও বেতারের মাধ্যমে তাঁর লেখা অসংখ্য বড়দের ও ছোটদের নাটক ও শিশুতোষ গান দর্শক শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। মরমী সঙ্গীত শিল্পী আবদুল আলীমের কন্ঠে তাঁর লেখা “নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা, কোন দূরে যাও চইলা” আজও গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে প্রিয় গান।
তিনি প্রায় ছয় দশক ধরে ছোটদের ও বড়দের জন্য লেখালেখি করেছেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জীবিত এ কলম সৈনিক স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে সক্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম ছড়া লেখার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। তিনি সৃজনশীল, সমাজ সচেতন ও জীবনধর্মী ছড়াকার ছিলেন। তাঁর ছন্দ জ্ঞান অসাধারণ, বিষয়বৈচিত্র্য অতুলনীয় ও শব্দের কারিগর অভিনব ও দৃষ্টান্তমূলক। তিনি তাঁর অসাধারণ জাদুময় লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ছড়া সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়ে গেছেন। সেজন্য তাঁকে ছড়া সাহিত্যের জাদুকর বলা হয়। জীবদ্দশায় তাঁকে ছড়ার জীবন্ত কিংবদন্তি বলে মনে করা হতো। তাঁর রচিত বর্গী এলো দেশে ও পান্তা ভাতে ঘি বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭টি। সেগুলো হলো বর্গী এলো দেশে, পান্তা ভাতে ঘি, নেবুর পাতা করমচা, আম পাতা জোড়া জোড়া, রফিকুল হক দাদাভাই এর সমকালীন ছড়া, বই বই হই চই, প্রাচীন বাংলার রূপকথা প্রভৃতি।
বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০০৯), অগ্রনী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরষ্কার, নিখিল ভারত শিশু সাহিত্য সংঘ সম্মাননা ও বিশ্বসাহিত্য সম্মেলনে (পাটনা ভারত) স্কোল অব অনার অর্জন করেন।
তিনি বার্ধক্যজনিত নানান জটিলতায় ভুগে ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
আজ শিশু সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিকুল হক দাদুভাই এর ২য় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
