
চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষকঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন কিছু নির্মাতার নাম উচ্চারণ করতে হয় যাদের কাজ কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের সংগ্রামকে গভীরভাবে ধারণ করে। সেই তালিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম হলেন তানভীর মোকাম্মেল। তিনি একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা, গবেষক ও লেখক—যিনি তাঁর চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, প্রান্তিক মানুষের জীবন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে এই প্রবন্ধে তাঁর জীবন, কর্ম ও চলচ্চিত্রভুবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১৯৫৫ সালের ৮ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন তানভীর মোকাম্মেল। জন্মস্থান বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চল। শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় থেকেই সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা, ইতিহাসের প্রতি কৌতূহল এবং মানুষের সংগ্রামের গল্প তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।
এই বোধই পরবর্তীকালে তাঁর চলচ্চিত্রের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রে আমরা দেখতে পাই ইতিহাসের অজানা অধ্যায়, মানুষের সংগ্রাম এবং জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।
তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্রে প্রবেশ মূলত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে। আশির দশকের শেষভাগে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে সক্রিয় হন। তাঁর প্রথম দিকের প্রামাণ্যচিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হল স্মৃতি একাত্তর। এই চলচ্চিত্রে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিতে তুলে ধরেন।
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন যে চলচ্চিত্র কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়; এটি ইতিহাস সংরক্ষণেরও এক শক্তিশালী মাধ্যম। ফলে তাঁর অধিকাংশ কাজেই মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মানুষের জীবনসংগ্রাম উঠে এসেছে।
তানভীর মোকাম্মেলের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো নদীর নাম মধুমতী। এই চলচ্চিত্রটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এবং এতে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে ফুটে উঠেছে। চলচ্চিত্রটি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং প্রশংসা অর্জন করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হলো লালসালু, যা কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-এর বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। ধর্মীয় ভণ্ডামি ও গ্রামীণ সমাজের ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
এছাড়াও তিনি নির্মাণ করেছেন রাবেয়া, যা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে দুই বোনের জীবনের গল্প তুলে ধরে। এই চলচ্চিত্রটি মানবিক আবেগ, যুদ্ধের নির্মমতা এবং নারীর সংগ্রামকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করেছে।
তানভীর মোকাম্মেল শুধু কাহিনিচিত্র নয়, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে বহু প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁর নির্মিত উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্যচিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ এবং স্মৃতি ৭১।
এই চলচ্চিত্রগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এবং শিল্পীদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে “স্মৃতি একাত্তর” চলচ্চিত্রটি মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে এবং এটি বাংলাদেশের প্রামাণ্যচিত্র ধারার একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তানভীর মোকাম্মেল-এর উল্লেখযোগ্য কাহিনিচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে অবদান নিচে সঠিকভাবে আলাদা করে দেওয়া হলো।
তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত উল্লেখযোগ্য কাহিনিচিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
নদীর নাম মধুমতী (১৯৯৬) — মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা কাহিনি ও সংলাপসহ একাধিক পুরস্কার লাভ করে।
চিত্রা নদীর পারে — পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী এক হিন্দু পরিবারের জীবন ও দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি সাতটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
লালসালু — লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-এর বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা পরিচালকসহ মোট আটটি পুরস্কার অর্জন করে।
রাবেয়া — মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি গ্রিক নাটক Antigone-এর একটি নতুন ব্যাখ্যা হিসেবে নির্মিত।
জীবনঢুলী — ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এক নিম্নবর্ণের ঢাকিবাদক মানুষের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র।
তানভীর মোকাম্মেল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবেও পরিচিত। তিনি মুক্তিযুদ্ধ, সমাজবাস্তবতা ও ইতিহাসকে কেন্দ্র করে বহু প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্যচিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
স্মৃতি একাত্তর — মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও গণহত্যার প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্যচিত্র।
Garment Girls of Bangladesh — বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করা নারী শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।
The Unknown Bard — বাউল সাধক ও লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র।
Tear Drops of Karnaphuli — কর্ণফুলী নদী ও নদীভিত্তিক মানুষের জীবন নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র।
A Tale of the Jamuna River — যমুনা নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীবনধারা নিয়ে নির্মিত একটি সামাজিক প্রামাণ্যচিত্র।
স্বপ্নভূমি — বাংলাদেশে বসবাসকারী বিহারিদের রাষ্ট্রহীনতার দীর্ঘ ইতিহাস ও সংকট তুলে ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে।
Tajuddin Ahmad: An Unsung Hero — বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা নি