
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নির্মাতা আছেন, যাঁরা সিনেমার ভাষাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁদের অন্যতম Agnès Varda। ফরাসি নিউ ওয়েভ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এই নির্মাতার জন্ম ১৯২৮ সালের ৩০ মে, বেলজিয়ামের ইক্সেলসে। জন্মদিনে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে। তিনি এমন একজন চলচ্চিত্র নির্মাণ শিল্পী, যিনি চলচ্চিত্রকে মানুষের জীবন, স্মৃতি, রাজনীতি, নারীবাদ এবং দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছিলেন।
আনিয়েস ভারদার জন্মনাম ছিল আরলেত ভারদা। শৈশবে তিনি পরিবারসহ ফ্রান্সে চলে আসেন। প্রথমে শিল্পকলার ইতিহাস ও আলোকচিত্র বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং দীর্ঘদিন পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীকালে আলোকচিত্রের অভিজ্ঞতাই তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাঁর ক্যামেরা সবসময় মানুষের মুখ, জীবনযাপন ও বাস্তবতার প্রতি এক বিশেষ সংবেদনশীল দৃষ্টি বহন করেছে।
১৯৫৫ সালে নির্মিত তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র La Pointe Courte-কে অনেক চলচ্চিত্র সমালোচক ফরাসি নিউ ওয়েভ আন্দোলনের পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচনা করেন। ছবিটি মুক্তি পায় সেই সময়, যখন নিউ ওয়েভের বিখ্যাত নির্মাতারা এখনও তাঁদের উল্লেখযোগ্য কাজ শুরু করেননি। বাস্তব লোকেশনে শুটিং, অ-পেশাদার অভিনয়শিল্পীর ব্যবহার এবং ডকুমেন্টারি ও কাহিনিচিত্রের মিশ্রণ—এসব বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালে নিউ ওয়েভের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে Cléo from 5 to 7, Vagabond, The Gleaners and I, The Beaches of Agnès এবং Faces Places। বিশেষ করে Cléo from 5 to 7 চলচ্চিত্রটি নারীর আত্মপরিচয়, সময় ও মৃত্যুভীতির এক অসাধারণ চলচ্চিত্রিক অনুসন্ধান হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। অন্যদিকে The Gleaners and I প্রমাণ করে যে জীবনের সাধারণ মানুষ এবং প্রান্তিক বাস্তবতাও কত গভীর শিল্পে রূপ নিতে পারে।
আনিয়েস ভারদার চলচ্চিত্রে নারীবাদ, সামাজিক বৈষম্য, স্মৃতি, বার্ধক্য এবং প্রান্তিক মানুষের জীবন বারবার ফিরে এসেছে। তিনি নিজেকে ‘joyful feminist’ বলে উল্লেখ করতেন। তাঁর কাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মানবিকতা ও কৌতূহল। তিনি চলচ্চিত্রে গল্প বলেননি, মানুষের অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপান্তর করেছেন।
চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে তাঁর নিজস্ব ধারণা ছিল ‘সিনে-এক্রিত্যুর’ (cinécriture), অর্থাৎ ‘চলচ্চিত্রে লেখা’। তাঁর মতে, পরিচালনা, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও চিত্রগ্রহণ—সবকিছু মিলেই চলচ্চিত্রের ভাষা তৈরি হয়। ফলে তাঁর প্রতিটি কাজেই দেখা যায় এক স্বতন্ত্র শিল্পভঙ্গি, যা তাঁকে অন্য নির্মাতাদের থেকে আলাদা করেছে।
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেন। ২০১৫ সালে তিনি Cannes Film Festival-এ সম্মানসূচক পাল্ম দ’অর গ্রহণকারী প্রথম নারী নির্মাতা হন। ২০১৭ সালে তিনি Academy Honorary Award লাভ করেন, যা তাঁকে এই সম্মানপ্রাপ্ত প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালকের মর্যাদা দেয়। একই বছর Faces Places চলচ্চিত্রের জন্য তিনি একাডেমি পুরস্কারের মনোনয়নও পান।
২০১৯ সালের ২৯ মার্চ প্যারিসে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তবে মৃত্যুর পরও তাঁর প্রভাব বিশ্ব চলচ্চিত্রে অমলিন। আজও নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা তাঁর কাজ থেকে শিখছেন কীভাবে ব্যক্তিগত স্মৃতি, সামাজিক বাস্তবতা ও শিল্পীসত্তাকে একসূত্রে গাঁথা যায়।
জন্মদিনে বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রগতিশীল পথিকৃৎ আনিয়েস ভারদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।