
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মুখ ও মুখোশ’ একটি অবিস্মরণীয় নাম। দেশের প্রথম বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্রটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পিয়ারী বেগম নাজমার নামও। চলচ্চিত্রের একেবারে শুরুর দিনের এই অভিনেত্রী আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন বাংলাদেশের সিনেমার জন্মলগ্নের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যায় এক সংগ্রামী ও গৌরবময় পথচলার ইতিহাস।
১৯৪০ সালে পুরান ঢাকার এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পিয়ারী বেগম নাজমা। তাঁর বাবা আবদুল মালেক তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মা আয়মানা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। পরিবারে সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ থাকলেও সে সময় চলচ্চিত্রে অভিনয়কে সমাজের অনেকেই ভালো চোখে দেখতেন না। তবুও শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তাঁকে ভিন্ন এক পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
শিক্ষাজীবনে তিনি টাঙ্গাইলের ভারতেশ্বরী হোমসে অধ্যয়ন করেন। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করার পর ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনেই তিনি বেতার নাটক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ তখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণ ছিল অত্যন্ত সাহসী ও চ্যালেঞ্জিং এক উদ্যোগ। এমন এক সময়ে চলচ্চিত্রকার আবদুল জব্বার খান তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর জন্য অভিনয়শিল্পী খুঁজছিলেন। ইডেন কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় পিয়ারী বেগম ও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু জহরত আরা একটি পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন দেখে অডিশনে অংশ নেন। অডিশনে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়েই পিয়ারী বেগমের চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা ঘটে।
১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পায় ‘মুখ ও মুখোশ’। ছবিটি এদেশে চলচ্চিত্রশিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রার সূচক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। ছবির অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন পিয়ারী বেগম নাজমা, পূর্ণিমা সেন, ইনাম আহমেদ, সাইফুদ্দীন, আব্দুল জব্বার খান, জহরত আরা, বিনয় বিশ্বাস ও আমিনুল হকসহ আরও অনেকে। সামাজিক নানা সংকোচ ও প্রতিবন্ধকতার সময়েও একজন নারী হিসেবে চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণ করে পিয়ারী বেগম নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ও হয়ে ওঠে এই চলচ্চিত্র।
‘মুখ ও মুখোশ’-এর শুটিং চলাকালেই অভিনেতা আমিনুল হকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। পরে ১৯৫৮ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের অন্যতম আলোচিত দম্পতি। তাঁদের একমাত্র সন্তান রবিউল আমিন পরবর্তীকালে বাংলাদেশ বিমানের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
চলচ্চিত্রে তাঁর কাজের পরিধি খুব দীর্ঘ না হলেও তিনি দীর্ঘদিন বেতার নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের অন্যতম অভিনেত্রী হিসেবে তিনি চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন।
২০২৩ সালের ৩০ মে রাজধানীর উত্তরার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন পিয়ারী বেগম নাজমা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। উত্তরার সেক্টর-১২ কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের যে যাত্রা ‘মুখ ও মুখোশ’ দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেই ইতিহাসের জীবন্ত অংশ ছিলেন পিয়ারী বেগম নাজমা। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে তাঁর নাম হয়তো খুব পরিচিত নয়, কিন্তু এদেশের চলচ্চিত্রের ভিত্তি নির্মাণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস যতদিন লেখা হবে, ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে পিয়ারী বেগম নাজমার নাম।