
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন একজন প্রথিতযশা নির্মাতা এবং বাংলা সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিকপাল। তিনি একাধারে গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা এবং আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের নান্দনিক ভাষা নির্মাণের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে পরিচিত। ২০১৩ সালের ৩০ মে কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তার মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যায় এক গভীর আবেগময়, চিন্তাশীল এবং সামাজিক বাস্তবতানির্ভর চলচ্চিত্রজগৎকে—যা তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নির্মাণ করে গেছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্ম ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায়। তিনি অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন সম্পন্ন করেন। চলচ্চিত্রে আসার আগে তিনি বিজ্ঞাপন জগতে কাজ করেন, যেখানে তিনি সৃজনশীল কপিরাইটার হিসেবে পরিচিতি পান। বিজ্ঞাপন জগতের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর চলচ্চিত্রের সংলাপ ও দৃশ্যভাষাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৯৯৪ সালে “হীরের আংটি” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পূর্ণদৈর্ঘ্য পরিচালনায় যাত্রা শুরু করেন। তবে তাঁর প্রকৃত সাফল্য আসে “উনিশে এপ্রিল” (১৯৯৫) ছবির মাধ্যমে, যা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে এবং তাঁকে শক্ত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি—“দহন”, “বাড়িওয়ালি”, “শূন্যে মনের কথা”, “শুভ মহরত”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে “চোখের বালি”, হিন্দি চলচ্চিত্র “রেইনকোট”, “নৌকাডুবি”, “উৎসব”, ” সব চরিত্র কাল্পনিক”, “দ্য লাস্ট ইয়ার” এবং তাঁর শেষ দিকের কাজ “সত্যান্বেষী” প্রভৃতি। তাঁর চলচ্চিত্রে মূলত মধ্যবিত্ত জীবনের সম্পর্ক, মানসিক দ্বন্দ্ব, নারীর অবস্থান, প্রেম এবং সমাজের ভেতরের ভাঙন উঠে এসেছে।
ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল সূক্ষ্ম সংলাপ, থিয়েটারধর্মী উপস্থাপনা এবং আবেগের গভীর স্তর। তিনি গল্পকে কেবল আখ্যান হিসেবে দেখেননি; বরং মানবমনের জটিল মানচিত্র হিসেবে নির্মাণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম তাঁর সৃষ্টিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যার প্রতিফলন একাধিক চলচ্চিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
তাঁর চলচ্চিত্র ভারতীয় সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রশংসিত হয়েছে। কান, বার্লিন এবং টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়। তিনি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হন।
দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। ২০১৩ সালের ৩০ মে সকালে কলকাতার নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়।
ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন এক চিন্তাশীল শিল্পী, যিনি বাংলা সিনেমাকে নতুন ভাষা দিয়েছেন। তাঁর কাজ আজও নতুন প্রজন্মের নির্মাতা ও দর্শকদের অনুপ্রেরণা জোগায়। মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্মতা, সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং আবেগের গভীরতা—সব মিলিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চলচ্চিত্র এখনো কথা বলে—নিঃশব্দে, গভীরভাবে, মানবিকতার ভাষায়।
মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান নির্মাতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।