
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ ১ জুন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী নার্গিস দত্ত–এর জন্মদিন। ১৯২৯ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ফাতিমা রশিদ। তবে চলচ্চিত্রজগতে তিনি ‘নার্গিস’ নামেই অমর হয়ে আছেন।
হিন্দি চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী অভিনেত্রীদের একজন হিসেবে নার্গিস শুধু অভিনয় দিয়েই নয়, তাঁর ব্যক্তিত্ব, সামাজিক কাজ এবং মানবিক উদ্যোগের কারণেও বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে তিনি এমন কিছু চরিত্র উপহার দিয়েছেন, যা আজও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
নার্গিসের মা জাদ্দানবাই ছিলেন একজন খ্যাতিমান গায়িকা, অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। খুব অল্প বয়সেই চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ঘটে। ১৯৩৫ সালে তলাশ-ই-হক ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। পরে তামান্না এবং তকদীর ছবির মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে রাজ কাপুর এবং নার্গিসের জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। বরসাত, আওয়ারা, শ্রী ৪২০, আগ ও চোরি চোরি–সহ একাধিক চলচ্চিত্রে তাঁদের রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। বিশেষ করে আওয়ারা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বহু দেশে ভারতীয় সিনেমার পরিচিতি বাড়িয়ে দেয়।
নার্গিসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত কাজ নিঃসন্দেহে মাদার ইন্ডিয়া। পরিচালক মেহবুব খানের এই চলচ্চিত্রে তিনি ‘রাধা’ চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি শুধু বাণিজ্যিকভাবেই নয়, সমালোচকদের কাছেও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে এবং একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে (অস্কার) বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন লাভ করে। এই ছবির জন্য নার্গিস ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন।
চলচ্চিত্রটির শুটিংয়ের সময় সহ-অভিনেতা সুনীল দত্ত–এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সুনীল দত্ত তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন বলে বহু সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর নার্গিস ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় তিন সন্তান—সঞ্জয় দত্ত, নম্রতা দত্ত ও প্রিয়া দত্ত।
চলচ্চিত্রের বাইরে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ‘স্পাস্টিকস সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’র প্রথম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের কল্যাণে কাজ করেন। তাঁর সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮০ সালে তাঁকে ভারতের রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য করা হয়।
দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রাত অউর দিন চলচ্চিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য নার্গিস ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান লাভ করেন। তিনি ছিলেন এই বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম অভিনেত্রী।
১৯৮১ সালের ৩ মে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন নার্গিস। হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন পরই পুত্র সঞ্জয় দত্তের প্রথম চলচ্চিত্র রকি মুক্তি পায়। তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয় নার্গিস দত্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে জাতীয় সংহতি বিষয়ক শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য প্রদত্ত সম্মাননার নামও রাখা হয়েছে ‘নার্গিস দত্ত পুরস্কার’।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অনেক তারকার আগমন ঘটেছে, আবার সময়ের স্রোতে অনেকেই হারিয়েও গেছেন। কিন্তু নার্গিস এমন এক শিল্পী, যাঁর অভিনয়, সৌন্দর্য, সংবেদনশীলতা এবং মানবিক উপস্থিতি আজও নতুন প্রজন্মকে মুগ্ধ করে।
জন্মদিনে এই মহীয়সী শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।