
শহরের ব্যস্ততা (একটি দীর্ঘ গদ্য কবিতা)
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
শহরের সকাল শুরু হয় হর্নের চিৎকারে, চায়ের দোকানের ধোঁয়া, বাস-মিনিবাসের ধাক্কাধাক্কি, আর তাড়া করে ছুটে চলা মানুষের পায়ের শব্দে। প্রতিটি মুখ যেন একেকটি মুখোশ—হাসি নেই, অথচ দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে, চোখে শুধু সময় হারিয়ে ফেলার ভয়। ছেলেটা স্কুলে যাচ্ছে, কাঁধে ঝোলা, চোখে ক্লান্তির ছায়া। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মহিলা বাজারের ব্যাগে কী যেন কষে ধরেছে, যেন ব্যস্ততাই তার পরিপূর্ণতা। আর মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ, যার হাতে কোনো গন্তব্য নেই, শুধু চোখে আছে বহুদিনের চেনা শহরের বিবর্ণ স্মৃতি। এই শহর ভালোবাসে না থেমে থাকা, দম ফেলার সুযোগ দেয় না। সিগন্যালের লাল বাতি পর্যন্ত যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে বারবার— কেউই চায় না থামতে, কেউই চায় না চোখ তুলে পাশে তাকাতে। যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে জন্মের পর থেকেই, আর শেষ নেই তার। দালান-কোঠার ছায়ায়, বিলবোর্ডে সাজানো হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে নিঃশব্দ আর্তনাদ, কোনো চাকরি হারা যুবক হয়তো দাঁড়িয়ে থাকে ইন্টারভিউয়ের পর, আর কফিশপে বসে থাকা মেয়েটির মোবাইলে বাজে একের পর এক ‘নট রিচেবল’ অভিমান। শহরের এই ব্যস্ততা কেবল বাইরের নয়, আমাদের মনেও জমে থাকে ট্রাফিক জ্যামের মতো বিষণ্ণতা— আলাপ হয় না, আলিঙ্গন নেই, প্রেমে আর ধৈর্য নেই, সব কিছুর মাঝে কেবল “সময় নেই, সময় নেই”। তবু সন্ধ্যা নামে। বাতিগুলো জ্বলে উঠে একে একে, আর শহরের কোলাহলের ভেতরেও আমি খুঁজি একটু নীরবতা, খুঁজে ফিরি—এক চা দোকানের কোণে বয়স্ক দুই বন্ধুর হাসিমুখ, খুঁজে ফিরি—ট্রাফিকের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টিভেজা ছেলেমেয়ের চোখের ভিতরের কথা। শহরের ব্যস্ততা আমাকে ক্লান্ত করে, কিন্তু তবু এই ব্যস্ততা আমাকে টেনে রাখে, কারণ এর মাঝেই আছে আমার প্রিয় মানুষের স্পর্শ, হাঁটুপড়া দিনের শেষটুকুতে মায়ের কণ্ঠ, আর নিজের স্বপ্নকে আবার দাঁড় করানোর এক দৃঢ় সংকল্প।