
চলচ্চিত্র সাংবাদিক ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে Zahir Raihan এমন একজন নির্মাতা যিনি চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজবাস্তবতা, রাজনৈতিক চেতনা এবং মানবিক সংকটকে শিল্পভাষায় প্রকাশ করার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র Kokhono Asheni ১৯৬১ সালে মুক্তি পায় এবং এটি পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই জহির রায়হান তাঁর স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেন। নির্মাণপটভূমিঃ ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্প ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করছিল। এই সময় অধিকাংশ চলচ্চিত্রই ছিল মূলত বিনোদননির্ভর। কিন্তু Zahir Raihan চলচ্চিত্রকে সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।

চলচ্চিত্র নির্মাণে তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল সহকারী পরিচালক হিসেবে। তিনি কাজ করেছিলেন Jago Hua Savera চলচ্চিত্রে, যা পরিচালনা করেছিলেন A. J. Kardar। এই অভিজ্ঞতা তাঁর চলচ্চিত্র দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি নিজের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং তৈরি করেন “কখনো আসেনি”। ছবিটি প্রযোজনা করেন সালাউদ্দিন এবং এটি মুক্তি পায় ২৪ নভেম্বর ১৯৬১ সালে। কাহিনি ও বিষয়বস্তুঃ “কখনো আসেনি” মূলত একজন শিল্পীর জীবনসংগ্রাম ও তার চারপাশের সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত। চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র শওকত, যার চরিত্রে অভিনয় করেন Khan Ataur Rahman। শওকত একজন দরিদ্র চিত্রশিল্পী, যিনি জীবনের নানা সংকটের মধ্যেও শিল্পচর্চা চালিয়ে যেতে চান। চলচ্চিত্রে মরিয়ম নামের এক নারী চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার চরিত্রে অভিনয় করেন Sumita Devi। মরিয়ম ধনী ও প্রভাবশালী সুলতানের অধীনে বসবাস করে এবং শওকতের সঙ্গে তার একটি আবেগঘন সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।
শওকতের জীবনে আরও একটি বড় দিক হলো তার পরিবারের দায়িত্ব। তার দুই ছোট বোনের লালন-পালনের দায়িত্ব তার কাঁধে। দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের জীবনযাপন চলচ্চিত্রে অত্যন্ত মানবিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। চলচ্চিত্রভাষা ও নন্দনচেতনাঃ “কখনো আসেনি” চলচ্চিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতীকী ও বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা। ছবির শুরুতে ঘোড়ার গাড়ির চাকা ঘোরার দৃশ্য সময়ের গতিশীলতার একটি রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধরনের প্রতীকী দৃশ্য ব্যবহার তৎকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে খুবই বিরল ছিল। চলচ্চিত্রটিতে শহুরে জীবন, দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম এবং সামাজিক বৈষম্যের বাস্তবচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ক্যামেরার ব্যবহারও ছিল তুলনামূলকভাবে বাস্তবধর্মী। অনেক দৃশ্যে প্রাকৃতিক আলো ও বাস্তব লোকেশন ব্যবহার করে পরিচালক চলচ্চিত্রটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছেন। চলচ্চিত্রটির সংগীত পরিচালনা করেন Khan Ataur Rahman। এতে গান পরিবেশন করেন Kalim Sharafi এবং Mahbuba Rahman। সংগীত চলচ্চিত্রটির আবেগঘন পরিবেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অভিনয় ও চরিত্র নির্মাণঃ চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেন Khan Ataur Rahman, Sumita Devi, Sanjib Dutta, Shabnam, Anima, shahidul Amin, Kona।

বিশেষভাবে সুলতান চরিত্রে সঞ্জীব দত্তের অভিনয় চলচ্চিত্রে একটি শক্তিশালী বিরোধী চরিত্রের উপস্থিতি তৈরি করে। শওকত চরিত্রটি একজন শিল্পীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে আটকে থাকা মানুষের প্রতীক হিসেবে নির্মিত। অন্যদিকে মরিয়ম চরিত্রটি সমাজে নারীর সীমাবদ্ধতা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। ঐতিহাসিক গুরুত্বঃ “কখনো আসেনি” বাংলা চলচ্চিত্রে জহির রায়হানের সৃষ্টিশীল যাত্রার সূচনা। এই চলচ্চিত্রের মধ্যেই তাঁর ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্রচিন্তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে তিনি নির্মাণ করেন Jibon Theke Neya, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রাজনৈতিক রূপকের এক অনন্য উদাহরণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে “কখনো আসেনি” কেবল একটি প্রথম চলচ্চিত্র নয়; বরং এটি এমন এক শিল্পীসত্তার সূচনা, যিনি চলচ্চিত্রকে সামাজিক প্রতিবাদ ও মানবিক চেতনার ভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন।
উপসংহারঃ সব মিলিয়ে “কখনো আসেনি” বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সৃষ্টি। এর কাহিনি, প্রতীকী উপস্থাপনা এবং মানবিক বাস্তবতার চিত্রায়ণ চলচ্চিত্রটিকে একটি গবেষণাযোগ্য শিল্পকর্মে পরিণত করেছে। এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই জহির রায়হান প্রমাণ করেছিলেন যে সিনেমা সমাজের বাস্তবতা ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে গভীর শিল্পভাষায় তুলে ধরতে পারে। তাঁর এই প্রথম পদক্ষেপই পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন ধারার সূচনা করে।