
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গত তিন দশকের ইতিহাস লিখতে গেলে যে কয়েকটি নাম বারবার ফিরে আসে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী নামগুলোর একটি শাকিব খান। ১৯৯৯ সালের ২৮ মে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত “অনন্ত ভালোবাসা” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সেই যাত্রা পেরিয়ে আজ তিনি ঢালিউডে ২৭ বছরে পদার্পণ করেছেন।
শাকিব খানের আসল নাম মাসুদ রানা। চলচ্চিত্রে আসার পর তিনি “শাকিব খান” নামেই পরিচিতি পান। নব্বই দশকের শেষদিকে যখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প নানা সংকটের মুখে, ঠিক সেই সময়েই ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেন তিনি। প্রথম ছবি দিয়ে বড় সাফল্য না এলেও, কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন প্রযোজক-পরিচালকদের প্রথম পছন্দ।
২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “প্রিয়া আমার প্রিয়া” ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। পরিচালক বদিউল আলম খোকন নির্মিত এই চলচ্চিত্র বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সফল হয় এবং শাকিব খানকে দেশের এক নম্বর নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। এরপর একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র—“আমার প্রাণের স্বামী”, “বলবো কথা বাসর ঘরে”, “ডন নাম্বার ওয়ান”, “নবাব”, “পাসওয়ার্ড”, “বীর”, “রাজনীতি”, “তুফান”, “প্রিয়তমা”, “রাজকুমার” ও “বরবাদ”—তাকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার অনন্য উচ্চতায়।
ঢালিউডে তাকে “কিং খান”, “নাম্বার ওয়ান শাকিব খান” কিংবা “ঢালিউডের ভাইজান” নামে ডাকা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে তার বক্স অফিস প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, অনেক সিনেমা হল মালিক এখনো ঈদ মৌসুমে শাকিব খানের ছবির দিকেই তাকিয়ে থাকেন।
তার অভিনয়জীবনের বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। একসময় যিনি মূলত বাণিজ্যিক অ্যাকশন ও রোমান্টিক চলচ্চিত্রের নায়ক ছিলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি গল্পনির্ভর ও ভিন্নধর্মী চরিত্রেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। “প্রিয়তমা” ছবিতে তার আবেগঘন অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। একইভাবে “তুফান” ও “বরবাদ” চলচ্চিত্র তাকে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও আরো জনপ্রিয় করে তোলে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গেও শাকিব খানের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য। তিনি কলকাতার বিভিন্ন প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন এবং দুই বাংলার দর্শকের কাছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সর্বজনীন বাংলা চলচ্চিত্র তারকা হিসেবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার প্রভাব বিস্ময়কর। তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ২৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত পোস্টে বলা হয়েছিল—“১৯৯৯ সালের ২৮ মে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক নতুন তারকার জন্ম হয়েছিল।” সেই পোস্ট ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ইউটিউব, ফেসবুক ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শাকিব খানকে ঘিরে প্রতিনিয়ত তৈরি হয় আলোচনা, ট্রেন্ড ও ভক্তদের আবেগঘন স্মৃতিচারণ।
বর্তমানে তিনি শুধু অভিনেতা নন; একজন প্রযোজক, ব্র্যান্ড এবং চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এসকে ফিল্মস দেশের বাইরেও বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার বিস্তারের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং বিশ্ববাজারে বাংলা সিনেমাকে তুলে ধরার স্বপ্নের কথাও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।
চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই তারকা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। নতুন প্রজন্মের নায়কদের আগমন, চলচ্চিত্র শিল্পের সংকট, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্যেও তিনি থেকে গেছেন দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে।
২৭ বছরে পদার্পণের এই মুহূর্তে শাকিব খান বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার সাফল্য, বিতর্ক, সংগ্রাম ও জনপ্রিয়তা মিলিয়ে তিনি আজও ঢালিউডের সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী নক্ষত্র।