
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী-এর মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০০ সালের ২০ জুন তিনি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যানসারে ভোগার পর ৭২ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি সময় পরেও তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক অবদান তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
বসন্ত চৌধুরীর জন্ম ১৯২৮ সালের ৫ মে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নাগপুরে এক শিক্ষিত ও সমৃদ্ধ পরিবারে। শৈশব ও কৈশোরের বড় অংশ কাটে নাগপুরেই। পরে কলকাতায় এসে তিনি চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ত হন। অভিনয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলার প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল।
১৯৫২ সালে পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের মহাপ্রস্থানের পথে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা সিনেমায় এক পরিশীলিত, শিক্ষিত ও মার্জিত নায়কের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব, উচ্চারণ ও অভিনয়শৈলী তাঁকে সমসাময়িক অনেক অভিনেতার থেকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
বসন্ত চৌধুরীর অভিনীত বহু চলচ্চিত্র আজও দর্শকদের কাছে সমাদৃত। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—দীপ জ্বেলে যাই, অন্ধারে আলো, রাজা রামমোহন, অভয়া ও শ্রীকান্ত, দিবারাত্রির কাব্য, দেবী চৌধুরাণী, হীরের আংটি প্রভৃতি। বিশেষ করে দীপ জ্বেলে যাই চলচ্চিত্রে সুচিত্রা সেন-এর বিপরীতে তাঁর অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। রাজা রামমোহন চলচ্চিত্রে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য তিনি ১৯৬৫ সালে বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (BFJA)-এর শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সংযত অথচ শক্তিশালী অভিনয় আজও প্রশংসিত।
অভিনেতা হিসেবে খ্যাতির পাশাপাশি বসন্ত চৌধুরী ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিত্ব। তিনি কলকাতার শেরিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরে নন্দন-এর চেয়ারম্যানও ছিলেন। এছাড়া নাটক, বেতার এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিরল মুদ্রা, শিল্পবস্তু, গণেশমূর্তি এবং কাশ্মীরি ও পারস্যের শালের সংগ্রাহক। তাঁর রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিশীলন তাঁকে চলচ্চিত্রজগতের বাইরে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিল।
বাংলা চলচ্চিত্রে যখন নায়ক বলতে অধিকাংশ সময় রোমান্টিক বা বাণিজ্যিক ছাঁচের চরিত্র বোঝানো হতো, তখন বসন্ত চৌধুরী শিক্ষিত, মার্জিত ও বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্রের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল সংযম, কণ্ঠে ছিল ব্যক্তিত্ব, আর উপস্থিতিতে ছিল এক ধরনের অভিজাত সৌন্দর্য।
মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।