
মিথ্যে মৃত্যু
আফছানা খানম অথৈ
আদিলের এরেঞ্জ ম্যারেজ। বাবা -মায়ের পছন্দে বিয়ে করেছে।বউটা লাল টুকটুকে খুব সুন্দরী।আদিল বউকে খুব ভালোবাসে।কিন্তু বউটা কেমন জানি লাজুক টাইপের। আদিলকে দেখলে কেমন জানি মুখ লুকিয়ে রাখে,লজ্জাবতী লতারমতো।কিন্তু তার হাভভাব দেখে মনে হয় সে তাকে খুব ভালোবাসে।কিন্তু এমন লজ্জাবতী লতার মতো জড়োসড়ো হয়ে যাচ্ছে কেনো? আদিল কিছুই বুঝতে পারছে না। বিয়ের তিন মাস পার হলো আদিলের শ্বশুর মেয়েকে বেড়াতে নিয়ে গেল। সপ্তাহ খানেক যেতে না যেতে খবর আসল আদিলের স্ত্রী ফারা মারা গেছে।খবর শুনে আদিল স্থির থাকতে পারলো না।ছুটে গেল শ্বশুর বাড়িতে।স্ত্রীর শোকে কাতর আদিল,কান্নায় জর্জরিত।বউয়ের সাথে কাঠানো স্মৃতিগুলো রোমান্থন হয়ে ভেসে উঠছে হৃদয় মন্দিরে।কোনকিছু তার ভালো লাগছে না।চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু সে কী! স্বশুর বাড়ির লোকজন তাকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করছে।শ্বাশুড়ির এককথা, আমার মেয়েকে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছ।আমরা তোমার জন্য নারী নির্যাতন মামলা করব। আদিল অবাক, এ কি বলছে শ্বাশুড়ি, তাদের মেয়ে তাদের বাড়িতে মারা গেছে।বলে কি না আমি মেরে ফেলেছি।এ কেমন কথা।তাছাড়া আমিতো তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতাম।আমি তাকে মারতে যাব কেনো? শুধু শ্বাশুড়ি নয়, পরিবারশুদ্ধ সবাই তাকে কটাক্ক করে কথা বলছে।আদিল কোন প্রতিবাদ না করে মুখ বুঝে সব সহ্য করছে। এর ফাঁকে ফারার কাপনের কাজ শেষ। দাফনের প্রস্তুতি চলছে….। সময়মতো জানাজা শেষ হলো। তাকে কবরে রাখা হলো।আদিলের মন খুব খারাপ সে আনমনা হয়ে বউয়ের কথা ভাবছে।তখনি স্ত্রীর পক্ষের একলোক কটাক্ক করে বলল, এখন কেঁদে কী লাভ?বউটাকে তো নির্যাতন করে মেরে ফেলেছ।যাও আর একটা বিয়ে কর গিয়ে…। একথা বলে তাকে জোরে ধাক্কামারে।আদিল কাত হয়ে পড়ে যায়।বিষন্ন মনে বাড়ি ফিরে আসে। বউকে ছাড়া একা একা লাগছে।কোনকিছু ভালো লাগছে না।বউয়ের সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো বারবার হৃদয় দুয়ারে দোল খাচ্ছে।মোবাইলে জমা আছে তার অনেক স্মৃতি।তা দেখার জন্য পকেটে হাত দিলো।কিন্তু সে কী! মোবাইল পকেটে নেই,তাহলে কোথায়?ভাবতে লাগল।অনেক ভাবনার পর মনে হলো মোবাইলটা হয়তো কবরস্থানে পড়ে গিয়েছে।খুঁজে দেখতে হবে।যেতে প্রস্তুত হলো। তখনি আদিলের মা কিছু টাকা দিয়ে বলল, বাবা আদিল ওই মোবাইলটা খোঁজার দরকার নেই।তুমি নতুন একটা কিনে নাও। আদিল আর বাড়াবাড়ি করলো না।মায়ের দেয়া টাকা দিয়ে একটা মোবাইল কিনে নিলো।তারপর তার আগের নাম্বারে কল দিলো।কল সার্ভিস হলো। শুধু তাই নয় কে যেন রিসিভ করলো।আদিল স্পষ্ট শব্দ শুনতে পাচ্ছে।কিন্তু কেউ কথা বলছে না।পুরো বিষয়টা তাকে অবাক করে তুললো।সে ছুটে আসল কবরস্থানে,তারপর এদিক সেদিক মোবাইল ফোনটা খুঁজতে লাগল।এমন সময় এক বয়স্ক লোক যিনি কবর খুঁড়েছিলে তিনি তার সামনে এসে দাঁড়ালো।এবং জিজ্ঞেস করলো, কী খুঁজছ? আদিল পুরো বিষয়টা তার কাছে প্রকাশ করলো।এবং কবর খোঁড়ার অনুমতি চাইল।লোকটি রাগাম্বিত হয়ে বলল, এই বিষয়টা যদি তোমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন জানতে পারে,নির্ঘাত মেরে ফেলবে।তাড়াতাড়ি ফালাও বলছি।উনারা লোক হিসাবে ভালো না।আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি মাত্র। আদিল লোকটিকে অনেক বুঝালো।সে কিছুতেই তাকে কবর খুঁড়তে দিলো না।সে বিষন্ন মনে বাড়ি ফিরে আসল।কিন্তু কবর খোঁড়ার বিষয়টা মাথা থেকে বাদ দিতে পারলো না।তার মাথায় একটাই চিন্তা আমার স্ত্রী যদি মারাই গেলো।তাহলে ফোন রিসিভ করলো কে? যেমন করে হোক রহস্যটা বের করতে হবেই।পরদিন রাত দুটোর সময় সে কবর খুঁড়তে গেল।শুরু করলো কবর খোঁড়া…। সে কী! অতি সহজে সে কবরটা খুঁড়ে ফেলল।মনে হয় কিছুক্ষণ আগে কেউ কবর খুঁড়েছে।মাটিগুলো খুব নরম হয়ে আছে।আদিল কবর খোঁড়ার পর তার স্ত্রীর লাশ দেখতে পেলো না।সে ছুটে গেল তার শ্বশুর বাড়ি। সে কী! সেখানে গিয়ে দেখে সবাই গল্প সল্পে ব্যস্ত।মেয়ে মারা গেছে শোক পালন করবে তা না।সবাই আনন্দ উল্লাস করছে।আদিলকে দেখে তার শ্বাশুড়ি কেনো জানি আতঙ্কিত হয়ে উঠল।কি বলবে না বলবে ভেবে পাচ্ছে না।তবুও জিজ্ঞেস করলো, আদিল তুমি এখানে? আগে বলুন আমার স্ত্রীর লাশ কবরে নেই কেনো? নেই মানে তাহলে তুমি চুরি করেছ। আমি চুরি করেছি মানে,লাশতো কবরে নেই।সত্যিই করে বলুন,আমার স্ত্রীর লাশ কোথায়? কোথায় মানে,তুমি চুরি করেছ।আমরা তোমাকে পুলিশে দেব। এমনিভাবে তারা আর ও কিছু সময় কথা কাটাকাটি করলো।কিন্তু কোন সমাধান হলো না।বরং আদিলকে পরিবারশুদ্ধ সবাই পুলিশের ভয় দেখালো।আদিল বাধ্য হয়ে সে স্থান ত্যাগ করলো। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে খুব কাঁদল।নামাজ শেষ হওয়ার পর ঈমাম সাহেব তার পাশে বসলেন,তারপর তার কাঁদার কারণ জানতে চাইলেন।আদিল নিঃসংকোচে মনের সব দুঃখ প্রকাশ করলো।ঈমাম সাহেব বললেন, এই পরিবারের লোকজন ভালো না।তুমি তাদের ভাগিনা জ্যাককে খুঁজে বের কর।তবে বুঝতে পারবে তোমার স্ত্রীর লাশ কোথায় আছে? ঈমাম সাহেবের কথা অনুযায়ী আদিল জ্যাককে খুঁজতে বের হলো।অল্প সময়ের মাঝে সে তাকে খুঁজে বের করলো।দরজায় কড়া নাড়তে দরজা খুলে দিলো এক নারী। সে কী! এ অন্য কেউ না।তার স্ত্রী ফারা।সে অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর জিজ্ঞেস করলো, ফারা তুমি না মরে গিয়েছ?এখানে আসলে কী করে? সে অনেক লম্বা কাহিনী। তুমি যাও এখান থেকে।তানা হলে মারা যাবে। আমি তোমাকে না নিয়ে যাব না।চলো আমার সঙ্ঘে? ফারা আসতে চাইল না।আদিল জোর করে তাকে গাড়িতে তুলল।তারপর বলল ফারা এবার বলো তুমি এখানে এলে কী করে? আমার ফুফাতো ভাই জ্যাক আমাদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করতো।সেই সুবাধে তার সাথে আমার পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা।তারপর সে আমাকে জোর করে নিয়ে যাই।বন্দি করে রেখে শারীরিক সম্পর্ক করে।এগুলো ইনটারনেটে ছেড়ে দেওয়ায়ার কথা বলে আমাকে রীতিমতো ব্ল্যাকমেইল করে।কিছুদিন থাকার পর সুযোগবুঝে আমি পালিয়ে আসি।তারপর বাবা-মা আপনার সঙ্ঘে আমাকে বিয়ে দেয়।আপনাদের বাড়িতে যাওয়ার পর বুঝতে পারি সত্যিকার ভালোবাসা।আপনার প্রতি আমার বড্ড মায়া হয়।আপনাকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসি।খোদার কাছে প্রার্থনা করি মৃত্যু অবধি যেন আপনার সঙ্ঘে থাকতে পারি।কিন্তু সেই সুখ আমার কপালে সইল না।জ্যাক আমার বাবা-মাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।তাই বাবা-মা বাধ্য হয়ে মিথ্যে মৃত্যুর নাটক করে আমাকে তার হাতে তুলে দেয়। এই সত্যটা তুমি আগে বললে পারতে। যদি আপনি আমাকে ভুল বুঝেন।তাড়িয়ে দেন তাই বলিনি।এবার আপনি আমাকে যেই শাস্তি দেবেন মাথা পেতে নেব।শুধু আমার একটা অনুরোধ…? বলো কী অনুরোধ? আমি যা করেছি পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে করেছি।আমাকে ভুল বুঝে তাড়িয়ে দেবেন না।মৃত্যু অবধি আপনার সঙ্গীনি হয়ে সেবা করার সুযোগ দিন।জ্যাকের হাত থেকে আমাকে ও আমার পরিবারকে রক্ষা করুন।সে মানুষ ভালো না,নেশাখোর জুয়াড়ি,লুচ্চা,…। তুমি চিন্তা করো না।জ্যাকের বিরুদ্ধে মামলা করব,পুলিশে দেব। আমি তোমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিলাম,এবং তোমাকে আমার জীবন সঙ্গীনি হিসেবে মেনে নিলাম। সত্যি বলছেন তো? হুম সত্যি। কখনো নষ্টা মেয়ে বলে তাড়িয়ে দেবেন নাতো? না দেব না।কারণ ক্ষমা মহত্বের লক্ষণ।তাছাড়া আমি তোমাকে মনে প্রাণে ভালোবাসি। সকল ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে দুজন সংসার জীবনে ফিরে আসল।আর জ্যাককে পুলিশের হাতে তুলে দিলো।সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করলো।অবসান হলো “মিথ্যে মৃত্যুর”। ঃ সমাপ্তঃ