
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও সম্পাদক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়-এর জন্মদিন। ১৯১৯ সালের ১৮ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বিহারের কাটিহারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো যেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তেমনি মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের হাসি-কান্না, প্রেম, সম্পর্ক ও সামাজিক বাস্তবতাকেও জীবন্ত করে তুলেছে।
অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সেহাখালায়। তাঁর পিতা সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মাতা মৃণালিনী দেবী। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়(বনফুল)-এর ছোট ভাই। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পারিবারিক পরিবেশ তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলা চলচ্চিত্রে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৫৯ সালে নির্মিত কিছুক্ষণ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। প্রথম চলচ্চিত্রেই তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। এরপর একে একে নির্মাণ করেন বহু স্মরণীয় চলচ্চিত্র। তাঁর ১৯৬১ সালের চলচ্চিত্র আহ্বান আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি লাভ করে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ২৬টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ৩টি টেলিফিল্ম এবং একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক নির্মাণ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ নিশিপদ্ম (১৯৭০), ধন্যি মেয়ে (১৯৭১), মৌচাক (১৯৭৪), অগ্নীশ্বর (১৯৭৫), পাকা দেখা (১৯৮০), নদী থেকে সাগরে প্রভৃতি। এসব চলচ্চিত্র বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় ধারাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। বিশেষ করে ধন্যি মেয়ে ও মৌচাক আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ক্লাসিক কমেডি হিসেবে সমাদৃত।
অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি নিশিপদ্ম। এই চলচ্চিত্রের কাহিনি পরবর্তীতে হিন্দিতে অমর প্রেম নামে নির্মিত হয়। অমর প্রেম চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের জন্য তিনি ১৯৭২ সালে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন।
অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর চলচ্চিত্রে সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ছবিতে গ্রামবাংলা, শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজ, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উঠে এসেছে। তিনি গল্প বলার সহজাত ক্ষমতার মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছে গেছেন।
২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। কিন্তু তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র আজও বাংলা সিনেমাপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও উপভোগ্য। তিনি চলচ্চিত্রের শিল্পমান ও জনপ্রিয়তার মধ্যে সফল সমন্বয় ঘটাত পেরেছিলেন। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নির্মাতা হিসেবে তিনি একদিকে সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছেন, অন্যদিকে সাধারণ দর্শকেরও অকুণ্ঠ ভালোবাসা অর্জন করেছেন।
জন্মদিনে বাংলা চলচ্চিত্রের এই কৃতী নির্মাতাকে গভীর শ্রদ্ধা।