
–ডাঃ কামরুল ইসলাম মনা
উপমহাদেশের প্রখ্যাত আধ্যাতিক সাধক বাউল সম্রাট লালন শাহের ১৩৩ তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে ৩ দিনব্যাপী মেলার আজ শেষ দিন। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ তার ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন “ গাজায় দম চড়িয়ে মনা বোমকালী আর বলিস নারে “ । মহামতি লালনের এ বানী আজ কেউ মানে না। এমনকি মাজারের গেইটের পূবের দিকে এ বানী লেখা সাইন বোর্ডও আজ উধাও । কেন উধাও এটা তার ভক্তরা সঠিক বলতে পারলেননা। তারপর ও গুরুর বাণী ভুলে আজ লালনের আখড়ায় তার ভক্তরা গাজায়,,,, ভরা। গাজা না খেলে যেন শির্ষ্যাদের কোন কিছু সাধন হয়না এমনই মনে হয়। কথিত আছে, লালন শাহ যৌবনকালে একবার তীর্থভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন সঙ্গীরা তাঁকে পরিত্যাগ করে চলে যায়। এমতাবস্থায় সিরাজ সাঁই নামে একজন মুসলমান ফকির তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রূষা দ্বারা সুস্থ করে তোলেন। পরে লালন তাঁর নিকট বাউলধর্মে দীক্ষিত হন এবং ছেউড়িয়াতে একটি আখড়া নির্মাণ করে স্ত্রী ও শিষ্যসহ বসবাস করেন। তাঁর কোনো সন্তানাদি ছিল না। তাঁর শিষ্যের সংখ্যা ছিল অনেক। লালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, কিন্তু নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের শাস্ত্র সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। তাঁর রচিত গানে সেই জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তিনি প্রায় দুহাজার গান রচনা করেন। তাঁর গান মরমি ব্যঞ্জনা ও শিল্পগুণে সমৃদ্ধ। সহজ-সরল শব্দময় অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী তাঁর গানে মানব জীবনের আদর্শ, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। লালন কোনো জাতিভেদ মানতেন না। তাই তিনি গেয়েছেন: ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ লালন কয় জাতির কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।’ এরূপ সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিমুক্ত এক সর্বজনীন ভাবরসে সিক্ত বলে লালনের গান বাংলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নিকট সমান জনপ্রিয়। তাঁর ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘বাড়ির কাছে আরশী নগর’, ‘আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে’ ইত্যাদি গান বাউল তত্ত্বসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। লালনের গান এক সময় এতই জনপ্রিয় ছিল যে, তা সাধারণ মানুষ ও নৌকার মাঝি-মাল্লাদের মুখে মুখে শোনা যেত। এমনকি বর্তমানেও সকল মহলে এ গানের কদর বাড়ছে এবং রেডিও-টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে। বহু তীর্থভ্রমণ এবং সাধু-সন্ন্যাসীদের সঙ্গলাভের পর ছেউড়িয়ার আখড়ায় বসেই লালন আজীবন সাধনা ও সঙ্গীতচর্চা করেন। লালনের লেখা গানের কোনো পান্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। সম্ভবত পরবর্তীকালে শিষ্যদের কেউ সেগুলি সংগ্রহ ও সংকলিত করেন। সাংস্কৃতিক এর রাজধানী কুষ্টিয়া তে এই দিবস কে উপলক্ষ করে কুষ্টিয়ার লালন আখড়া বাড়িতে ১৭, ১৮, ১৯ এই ৩ দিন লালন তিরোধান দিবসের মেলায় দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দরা এসেছেন।
