
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অনেক শিল্পীর নাম আছে, যারা কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন না, কিন্তু তাদের শ্রম ও শিল্পবোধ ছাড়া চলচ্চিত্রের ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। তারা পর্দার সামনে নন—পর্দার আড়ালের শিল্পী। কিন্তু তাদের কাজই সময়কে ধরে রাখে, স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে, এবং চলচ্চিত্রের এক অদৃশ্য ইতিহাস নির্মাণ করে। এই নেপথ্য শিল্পীদের অন্যতম হলেন কিংবদন্তি স্থিরচিত্রগ্রাহক জি. ডি. পিন্টু। আশির দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি বাংলাদেশের অসংখ্য চলচ্চিত্রে স্থিরচিত্র ধারণ করেছেন। তাঁর ক্যামেরার লেন্স শুধু দৃশ্য ধারণ করেনি; বরং বন্দি করেছে একটি সময়ের আবেগ, শিল্পীদের পরিশ্রম, পরিচালক ও অভিনেতাদের সৃষ্টিশীল মুহূর্ত, এবং সিনেমার নান্দনিক সৌন্দর্য। আজকের ডিজিটাল যুগে একটি ছবি তোলা যত সহজ, আশির বা নব্বইয়ের দশকে তা ছিল অনেক কঠিন ও শ্রমসাধ্য। ফিল্ম ক্যামেরা, সীমিত রোল, অন্ধকার ঘরে নেগেটিভ ধোয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে একটি ছবি তৈরি হতো অনেক যত্ন ও ধৈর্যের মধ্য দিয়ে। সেই সময়ের স্থিরচিত্রগ্রাহকদের কাজ ছিল শুধু ছবি তোলা নয়; বরং চলচ্চিত্রের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেই সোনালি সময়, কাজের অভিজ্ঞতা, শিল্পদর্শন এবং বর্তমান চলচ্চিত্রের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন জি. ডি. পিন্টু। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক ফাহিম শাহরিয়ার রুমি।
ব্যক্তিগত জীবন ও শুরুর গল্পঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠার গল্প জানতে চাই। কীভাবে স্থিরচিত্রের জগতে আসা? জি. ডি. পিন্টু: আমার শৈশব ছিল খুবই সাধারণ। সিনেমা তখন আমাদের কাছে শুধু বিনোদন ছিল না, এক ধরনের বিস্ময়ের জগৎ। ছোটবেলায় সিনেমা দেখতে গেলে মনে হতো যেন অন্য এক পৃথিবীতে চলে গেছি। কিন্তু তখন কখনো ভাবিনি যে একদিন সেই জগতেরই একজন হয়ে উঠব। এক আত্মীয়ের কাছ থেকে প্রথম একটি ক্যামেরা হাতে পাই। সেই ক্যামেরা দিয়েই শুরু। প্রথমে আশপাশের মানুষ, রাস্তা, প্রকৃতি—যা চোখে পড়ত তাই ছবি তুলতাম। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, একটি ছবি শুধু একটি মুহূর্তকে ধরে রাখে না; এটি সময়কে সংরক্ষণ করে। সেই উপলব্ধিই আমাকে স্থিরচিত্রের পথে নিয়ে আসে। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আশির দশকে চলচ্চিত্রের স্থিরচিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ শুরু—সেই সময়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? জি. ডি. পিন্টু: সেই সময়টা ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক প্রাণবন্ত সময়। এফডিসিতে ঢুকলেই বোঝা যেত কতটা ব্যস্ত একটি শিল্প ছিল এটি। বিভিন্ন সেটে শুটিং চলছে, আলো জ্বলছে, শিল্পীদের আসা-যাওয়া—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত কর্মচাঞ্চল্য। তখন প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। ফিল্ম ক্যামেরা দিয়ে কাজ করতে হতো, প্রতিটি রোল খুব হিসাব করে ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই একটা আলাদা আনন্দ ছিল। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: প্রথম কোন চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন? সেই স্মৃতি কতটা রোমাঞ্চকর? জি. ডি. পিন্টু: প্রথমদিকে কয়েকটি ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করেছি। পরে একটি ছবিতে পূর্ণাঙ্গ স্থিরচিত্রগ্রাহক হিসেবে সুযোগ পাই। সেই সময় মনে হয়েছিল যেন বড় এক দায়িত্ব হাতে পেয়েছি। কারণ এই ছবিগুলোই পরে পোস্টার হবে, পত্রিকায় ছাপা হবে, দর্শকের কাছে ছবির প্রথম পরিচয় হয়ে উঠবে। সোনালি যুগের চলচ্চিত্রঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আশি ও নব্বইয়ের দশকের চলচ্চিত্র পরিবেশকে আপনি কীভাবে দেখেন? জি. ডি. পিন্টু: আমি মনে করি সেটাই ছিল আমাদের চলচ্চিত্রের প্রাণের সময়।
স্টুডিওগুলো সবসময় ব্যস্ত থাকত। পরিচালকরা গল্প নিয়ে অনেক ভাবতেন। শিল্পীরাও চরিত্র নিয়ে কাজ করতেন খুব মন দিয়ে। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: সেই সময়ের শিল্পী ও টিমওয়ার্কের সঙ্গে আজকের সময়ের পার্থক্য কী? জি. ডি. পিন্টু: তখন সবাই কাজকে একটা শিল্প হিসেবে দেখতেন। নায়ক-নায়িকা, পরিচালক, টেকনিশিয়ান—সবাই একসঙ্গে কাজ করতেন। এখন প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, কিন্তু সেই আন্তরিকতা অনেক জায়গায় কমে গেছে। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: তখনকার পোস্টার ও প্রচারণায় স্থিরচিত্রের গুরুত্ব কতটা ছিল? জি. ডি. পিন্টু: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন তো সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। একটি সিনেমার পোস্টার বা লবিকার্ডই ছিল দর্শকের কাছে ছবির প্রথম পরিচয়। তাই স্থিরচিত্রের ওপর অনেক দায়িত্ব থাকত। শিল্পদর্শন ও নন্দনচিন্তাঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: একটি দৃশ্যকে স্থিরচিত্রে বন্দি করার সময় কী বিষয়গুলো গুরুত্ব দেন? জি. ডি. পিন্টু: আমি প্রথমে আবেগটা দেখি। একটি দৃশ্যের আলো, চরিত্রের অভিব্যক্তি এবং পরিবেশ—এই তিনটি বিষয় যদি ঠিকভাবে ধরা যায়, তাহলে ছবিটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: একটি ভালো ফিল্ম স্টিলের বৈশিষ্ট্য কী? জি. ডি. পিন্টু: ভালো ফিল্ম স্টিল এমন হওয়া উচিত, যা দেখলে মনে হবে এর ভেতরে একটি গল্প আছে। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: স্থিরচিত্র কি চলচ্চিত্র ইতিহাসের দলিল? জি. ডি. পিন্টু: অবশ্যই। অনেক পুরোনো ছবির প্রিন্ট এখন আর নেই। কিন্তু স্থিরচিত্র থেকে আমরা সেই সময়ের চলচ্চিত্র সম্পর্কে ধারণা পাই। বর্তমান চলচ্চিত্রের সংকটঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বর্তমান সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের সংকটকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? জি. ডি. পিন্টু: আমার মনে হয় আমরা দর্শকের সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছি। ভালো গল্পের অভাবও একটি বড় কারণ। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের কাজকে কীভাবে দেখছেন? জি. ডি. পিন্টু: আমি আশাবাদী।
অনেক তরুণ নতুন চিন্তা নিয়ে কাজ করছেন। যদি তারা ধৈর্য ধরে কাজ করেন, তাহলে ভবিষ্যৎ ভালো হবে। ভবিষ্যৎ ভাবনাঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী? জি. ডি. পিন্টু: মানুষ যখন আমার তোলা ছবি চিনতে পারে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: কোনো আক্ষেপ আছে? জি. ডি. পিন্টু: আক্ষেপ একটাই—আমরা আমাদের চলচ্চিত্রের অনেক স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারিনি। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশি চলচ্চিত্র কেমন? জি. ডি. পিন্টু: যে চলচ্চিত্র আমাদের সংস্কৃতি ও মানুষের গল্পকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে। ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: জীবন ও শিল্প—এই দুইয়ের সম্পর্ক কী? জি. ডি. পিন্টু: শিল্প আসলে জীবনেরই প্রতিফলন। আমরা যা দেখি, যা অনুভব করি—সবই কোনো না কোনোভাবে শিল্প হয়ে ফিরে আসে।