
চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষকঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি বাংলাদেশের বিকল্পধারার চলচ্চিত্রচর্চায় Tanvir Mokammel এমন এক নির্মাতার নাম, যিনি শিল্পকে কখনও বাজারের পণ্যে পরিণত করেননি; বরং চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করেছেন ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজবিশ্লেষণের এক বৌদ্ধিক মাধ্যম হিসেবে। তাঁর নির্মাণে যেমন আছে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশভাগের গভীর পাঠ, তেমনি আছে প্রান্তিক মানুষের জীবনবাস্তবতা ও রাষ্ট্র–সমাজের ক্ষমতাকাঠামোর সমালোচনা। তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র Nodir Naam Modhumoti বাংলাদেশের সিনেমায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এখানে মুক্তিযুদ্ধকে কেবল বীরত্বের গৌরবগাথা হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং যুদ্ধকালীন গ্রামীণ সমাজের অভ্যন্তরীণ সংকট, বিভক্তি ও নৈতিক টানাপোড়েনকে সামনে আনা হয়েছে। নদী ‘মধুমতি’ কেবল ভৌগোলিক সত্তা নয়, এটি সময় ও স্মৃতির প্রতীক। যুদ্ধ মানুষের ভেতরের ভাঙনকেও উন্মোচিত করে—এই সত্যটিকে তিনি সংযত অথচ গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্রটির ধীর গতি, প্রাকৃতিক লোকেশন এবং অনাড়ম্বর নির্মাণশৈলী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ধারায় এক ভিন্ন ভাষা নির্মাণ করে। দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ Chitra Nodir Pare। পূর্ববঙ্গের এক হিন্দু পরিবারের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে পরিচয়ের সংকট, ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার আবহ নির্মিত হয়েছে গভীর মানবিকতায়।
এখানে তানভীর মোকাম্মেল উচ্চকণ্ঠ নন; বরং দীর্ঘ শট, নীরবতা এবং পরিবেশের ভেতর দিয়ে সময়ের রাজনৈতিক অভিঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয় এবং বাংলাদেশের বিকল্পধারার সিনেমাকে বিশ্বদর্শকের সামনে নতুনভাবে পরিচিত করে। নারীর অবস্থান, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর শক্তিশালী কাহিনিচিত্র Rabeya বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে দুই বোনের জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি পিতৃতান্ত্রিক শাসন ও ধর্মীয় গোঁড়ামির নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্রটি কেবল একটি দেশের গল্প নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নকে স্পর্শ করে। দৃশ্যবিন্যাসে সংযম, সংলাপে মিতব্যয়িতা এবং আবহসঙ্গীতে নীরবতার ব্যবহার—এসব মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি এক অন্তর্মুখী নন্দনতত্ত্ব নির্মাণ করে। তানভীর মোকাম্মেলের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন, যেখানে বাম আন্দোলন, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম এবং সামাজিক রূপান্তরের ইতিহাস উঠে এসেছে। তাঁর প্রামাণ্যচিত্রগুলোতে গবেষণার গভীরতা ও দলিলনির্ভরতা স্পষ্ট। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র কেবল শিল্প নয়, ইতিহাসচর্চারও অংশ হয়ে ওঠে। নির্মাণশৈলীতে তিনি বাণিজ্যিকতার বিপরীতে দাঁড়ানো এক শিল্পী। দীর্ঘ শট, বাস্তব লোকেশন, প্রাকৃতিক আলো এবং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক নির্মাণ তাঁর ছবির বৈশিষ্ট্য। সংলাপের চেয়ে দৃশ্যই বেশি কথা বলে—এই বিশ্বাসে তিনি অবিচল। তাঁর চলচ্চিত্রে কোনো কৃত্রিম আবেগের বিস্ফোরণ নেই; বরং রয়েছে অন্তর্গত বেদনা ও সামাজিক প্রশ্নের নীরব অনুরণন।
চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তিনি একজন লেখক ও গবেষক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন নিয়ে তাঁর প্রবন্ধসমূহ গবেষণার ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখেছে। ফলে তিনি কেবল নির্মাতা নন, এক সাংস্কৃতিক বুদ্ধিজীবীও বটে। আজকের বাজারনির্ভর ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক সময়ে তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্র নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। কারণ তাঁর কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—চলচ্চিত্র মানে কেবল বিনোদন নয়; এটি স্মৃতির সংরক্ষণ, ইতিহাসের পুনর্পাঠ এবং ন্যায়বোধের পক্ষে শিল্পসম্মত অবস্থান। বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র যে বৌদ্ধিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার অন্যতম নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল। তাঁর কর্ম ও অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চলচ্চিত্রচর্চায় দীর্ঘদিন পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।