
চলচ্চিত্র সাংবাদিক ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বাংলাদেশের সমসাময়িক চলচ্চিত্রে ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের গভীর বেদনার কাহিনি তুলে ধরার ক্ষেত্রে যে ক’জন নির্মাতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন Akram Khan। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র Khacha (খাঁচা) বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি মূলত দেশভাগের প্রেক্ষাপটে মানুষের বেদনাবিধুর বাস্তবতা, ধর্মীয় বিভাজন এবং মানবিক সংকটের গল্প তুলে ধরে। সাহিত্যিক Hasan Azizul Haque-এর একই নামের ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্রের ধারায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নির্মাণ ও প্রেক্ষাপটঃ ‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণের মূল অনুপ্রেরণা এসেছে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের ইতিহাস থেকে। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের ফলে উপমহাদেশে যে ব্যাপক সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়, সেই প্রেক্ষাপটই চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রবিন্দু।
গল্পটি মূলত পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত এক হিন্দু পরিবারের জীবনসংকটকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, যারা দেশভাগের পর ভারতে চলে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক আকরাম খান এবং অভিনেতা Azad Abul Kalam। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন Jaya Ahsan, আজাদ আবুল কালাম এবং Mamunur Rashid। চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা করেছে Impress Telefilm এবং এটি সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত একটি চলচ্চিত্র। ২০১৫ সালে এর শুটিং শুরু হয় এবং নড়াইল, মুন্সিগঞ্জ ও নাটোরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে চিত্রায়িত হয়। ২০১৬ সালে চলচ্চিত্রটির কাজ সম্পন্ন হয় এবং ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এটি মুক্তি পায়। কাহিনির সংক্ষিপ্ত রূপঃ ‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রের কাহিনি একটি ব্রাহ্মণ পরিবারের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত বহু হিন্দু পরিবার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণে ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই যাত্রা কখনোই সহজ ছিল না।
চলচ্চিত্রে দেখা যায়, এক হিন্দু পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের সঙ্গে একটি মুসলিম পরিবারের সম্পত্তি বিনিময়ের বিষয়ও জড়িত থাকে। কিন্তু দেশ, ভিটেমাটি, স্মৃতি এবং মানুষের আবেগ—সবকিছু মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে পরিবারটির সদস্যরা এক গভীর মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়। এই কাহিনির মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি দেখাতে চেয়েছে—দেশভাগ শুধু রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি মানুষের জীবনে ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করেছিল। চরিত্র ও অভিনয়ঃ চলচ্চিত্রটির অন্যতম শক্তি এর অভিনয়শিল্পীদের দক্ষতা।
জয়া আহসান অভিনীত চরিত্র ‘সরোজিনী’ একটি জটিল মানসিক অবস্থার প্রতীক। তিনি এমন এক নারী চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, যিনি দেশভাগের বাস্তবতার মধ্যে পড়ে নিজের পরিচয় ও অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে আজাদ আবুল কালাম ও মামুনুর রশীদের অভিনয় চলচ্চিত্রে গভীর বাস্তবতা এনে দিয়েছে। তাঁদের অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক দেশভাগের সময়কার সামাজিক ও পারিবারিক টানাপোড়েন অনুভব করতে পারে। চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা ও নির্মাণশৈলীঃ ‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ধীরগতির কিন্তু গভীর অর্থবহ বর্ণনাভঙ্গি। পরিচালক আকরাম খান এখানে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে একটি শিল্পধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। চলচ্চিত্রটির দৃশ্যায়নে গ্রামীণ বাংলার প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা ও সময়ের পরিবর্তন অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ক্যামেরার দীর্ঘ শট, নীরবতার ব্যবহার এবং সংলাপের সংযম চলচ্চিত্রটিকে একটি গভীর আবহ প্রদান করেছে।
একই সঙ্গে চলচ্চিত্রটির প্রতীকী অর্থও গুরুত্বপূর্ণ। “খাঁচা” শব্দটি এখানে কেবল একটি বস্তু নয়; এটি মানুষের সামাজিক, ধর্মীয় ও মানসিক বন্দিত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষ যখন ধর্ম, জাতি বা রাষ্ট্রের বিভাজনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার জীবন যেন এক অদৃশ্য খাঁচার মধ্যে বন্দি হয়ে যায়—চলচ্চিত্রটি এই দর্শনকেই তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিঃ ‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ৯০তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস-এ (Oscars) সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই চলচ্চিত্রটি মনোনীত হয়েছিল। যদিও এটি শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পায়নি, তবুও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। সমালোচনা ও গ্রহণযোগ্যতাঃ সমালোচকদের মতে, ‘খাঁচা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কিছুটা কঠিনধর্মী চলচ্চিত্র। এর ধীরগতির বর্ণনা ও গভীর প্রতীকী ভাষা সাধারণ দর্শকের কাছে সবসময় সহজবোধ্য নাও হতে পারে। ফলে মুক্তির সময় চলচ্চিত্রটি খুব বেশি বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এমনকি ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সে অল্প সময় প্রদর্শনের পর এটি হল থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ‘খাঁচা’ বাংলাদেশের ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং এটি ইতিহাস ও সমাজের গভীর সত্যও তুলে ধরতে পারে।
উপসংহারঃ সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, ‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সৃষ্টি। দেশভাগের মতো জটিল ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা ও মানসিক দ্বন্দ্বকে পরিচালক আকরাম খান অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি ও ইতিহাসের বড় বড় সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে অসংখ্য সাধারণ মানুষের অজানা কষ্ট ও বিচ্ছেদের গল্প। ‘খাঁচা’ সেই অজানা ইতিহাসেরই এক শিল্পসম্মত উপস্থাপন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রভুবনে ইতিহাসভিত্তিক ও সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারাকে এগিয়ে নিতে ‘খাঁচা’ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।