
চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষকঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ষাট ও সত্তরের দশক ছিল পরিবর্তন ও সম্ভাবনার সময়। এই সময়ের চলচ্চিত্র আন্দোলনে যেসব নির্মাতা নিজেদের সৃজনশীলতা দিয়ে নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম কাজী জহির। গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ, মানবিক আবেগ এবং সামাজিক বাস্তবতার মিশেলে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

১৯২৭ সালের ১০ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের ভূখণ্ডে তথা ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন কাজী জহির। পরবর্তীকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ—দুই সময়েই চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্র জগতের প্রতি গভীর আগ্রহ থেকেই তিনি এই শিল্পমাধ্যমে প্রবেশ করেন। ধীরে ধীরে পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একাধিক জনপ্রিয় ও আলোচিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৯২ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর চলচ্চিত্র আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে।

কাজী জহিরের চলচ্চিত্র জীবন শুরু হয় ষাটের দশকে। ১৯৬৫ সালে চলচ্চিত্র “বন্ধন” নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। সেই সময় ঢাকার চলচ্চিত্র শিল্প ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছিল এবং নতুন গল্প, নতুন নির্মাণশৈলী নিয়ে অনেক পরিচালক কাজ করছিলেন। এই সময়েই তিনি নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র “নয়ন তারা” (১৯৬৭), যা তাঁকে একজন সম্ভাবনাময় নির্মাতা হিসেবে পরিচিত করে তোলে। এর পরের বছরগুলোতে তিনি ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেমন “ময়না মতি” (১৯৬৯), “মধুমিলন” (১৯৭০) এবং “মীনা” (১৯৭০)। এসব চলচ্চিত্রে প্রেম, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের আবেগঘন গল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের জীবন, আশা ও পুনর্গঠনের গল্প তখন চলচ্চিত্রে উঠে আসতে শুরু করে। এই সময় কাজী জহির নির্মাণ করেন উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র অবুঝ মন। ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে অভিনয় করেন তৎকালীন জনপ্রিয় তারকা রাজ্জাক ও শাবানা। চলচ্চিত্রটির গল্পে একটি হিন্দু মেয়ের সঙ্গে মুসলিম তরুণ চিকিৎসকের প্রেমের কাহিনি তুলে ধরা হয়, যেখানে ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে মানবিক ভালোবাসার জয়কে দেখানো হয়েছে।
স্বাধীনতার পরপর সময়ের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং ১৯৭৩ সালে ভারত-বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়। কাজী জহিরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো বধূ বিদায়। ১৯৭৮ সালে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ ও কবরী সারওয়ার এবং আবারও শাবানা। ছবিটির গল্প পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম এবং সামাজিক টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বুলবুল আহমেদ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান লাভ করেন।

কাজী জহিরের চলচ্চিত্র নির্মাণের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর গল্প বলার ধরন। তিনি সাধারণ মানুষের জীবন থেকে গল্প সংগ্রহ করতেন। তাঁর ছবিতে গ্রামীণ সমাজ, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম এবং সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো খুবই গুরুত্ব পেত। তিনি বিশ্বাস করতেন চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের জীবন ও সমাজের প্রতিচ্ছবি। তাই তাঁর ছবিতে অতিরঞ্জিত নাটকীয়তার চেয়ে বাস্তবতার স্পর্শ বেশি দেখা যায়। চিত্রনাট্য ও দৃশ্য নির্মাণেও কাজী জহির ছিলেন সংযত ও সচেতন। তাঁর চলচ্চিত্রে চরিত্রগুলো সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রগুলোও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। অনেক সময় তাঁর চলচ্চিত্রে সংগীত ও আবহসংগীত গল্পের আবেগকে গভীর করে তুলেছে। বিশেষ করে সত্তরের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে যে সুরেলা সংগীতধারা গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গেও তাঁর ছবিগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। চলচ্চিত্র শিল্পে কাজী জহিরের আরেকটি বড় অবদান হলো নতুন শিল্পী ও কলাকুশলীদের সুযোগ করে দেওয়া। তাঁর সঙ্গে কাজ করা অনেক অভিনেতা ও প্রযুক্তিকর্মী পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠিত হন। একজন নির্মাতা হিসেবে তিনি শুটিং সেটে অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ ও ধৈর্যশীল ছিলেন বলে সহকর্মীরা স্মরণ করেছেন।
আশির দশকেও তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যান। তাঁর পরিচালিত “ফুলের মালা” (১৯৮৭) চলচ্চিত্রটি সেই সময়ের দর্শকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এ সময় তাঁর চলচ্চিত্রে পারিবারিক নাটক, সামাজিক মূল্যবোধ এবং প্রেমের গল্প আরও বেশি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে কাজী জহিরকে অনেক সময় “গল্পনির্ভর নির্মাতা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কারণ তিনি চলচ্চিত্রে চমকপ্রদ দৃশ্যের চেয়ে মানবিক গল্পকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর চলচ্চিত্রে সমাজের ভেতরের সম্পর্ক, মানুষের আশা-হতাশা এবং ভালোবাসার শক্তি বারবার ফিরে এসেছে। ১৯৯২ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বাংলা সিনেমার স্বর্ণালী সময়ের স্মারক হয়ে আছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর নাম অনিবার্যভাবেই উচ্চারিত হয়। তিনি হয়তো প্রচারের আলোয় খুব বেশি ছিলেন না, কিন্তু তাঁর নির্মাণশৈলী এবং মানবিক গল্প বলার ক্ষমতা বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। আজকের নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য কাজী জহিরের কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। তাঁর চলচ্চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি ভালো গল্প, আন্তরিক নির্মাণ এবং মানুষের জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থাকলে চলচ্চিত্র সত্যিই সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকতে পারে।