
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বিনোদন সাংবাদিক ::
গতকাল ১০ই অক্টোবর ছিল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি বাংলাদেশী গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার। তিনি একজন সমাজ সচেতন, আধুনিক চিন্তাশীল, মনস্তাত্ত্বিক, বাস্তববাদী ও জীবনমুখী লেখক ছিলেন। তাঁর রচনায় সমাজের বাস্তবচিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। তিনি তাঁর রচনার বিষয়বস্তু, কাঠামো ও ভাষাভঙ্গিতে এক নতুন ঘরানার সৃষ্টি করেছেন।
তিনি ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ আহমাদুল্লাহ ও মা নাসিমা আরা খাতুন। তাঁর বাবা-মা উভয়েই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত ও রুচিশীল ও সমৃদ্ধ পরিবারের সন্তান।
তিনি তাঁর বাবার সরকারি চাকুরী সূত্রে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করেন। সেই কারণে তাকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করতে হয়েছে। তিনি ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক, ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৪৩ সালে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ বিএ পাশ করেন৷
কর্মজীবনে তিনি ১৯৪৫-৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতার ইংরেজি দৈনিক স্টেটসমেন্ট পত্রিকায় চাকরি করেন। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় ফিরে এসে ১৯৪৮-৫০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের করাচি কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫০-৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্সের দূতাবাসে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ইউনেস্কোতে নিযুক্ত হন এবং ১৯৭০ সালের ৩১ অক্টোবর তাঁর চাকরির মেয়াদ শেষ হয়। তিনি ফ্রান্সের প্যারিসেই থেকে যান।
ব্যক্তি জীবনে তিনি ফরাসি নাগরিক আন মারি লুই রোজিতা মার্সেল তিবো (আজিজা মোসাম্মত নাসরিন) এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সিমিন ওয়ালীউল্লাহ ও ইয়াজ ওয়ালীউল্লাহ নামে তাঁদের পুত্র ও কন্যা সন্তান রয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সুদূর ফ্রান্সের প্যারিসে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত তৈরি করেন এবং অর্থ সংগ্রহ করে কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন মানুষ।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক স্তম্ভ প্রতিম কথাশিল্পী। তিনি অস্তিত্ববাদী ঔপন্যাসিক এবং বাংলা উপন্যাসে চেতনা প্রবাহ রীতির প্রথম প্রয়োগ করেন। তাঁর রচনায় গ্রাম বাংলার ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের বাস্তব চিত্র, সমাজ জীবনের অন্ধকার দিক, গ্রাম বাংলার নিম্ন শ্রেণির মানুষদের করুণচিত্র তির্যকভাবে ফুটে উঠেছে।
তাঁর রচিত সাহিত্যের ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পের নাম হঠাৎ আলোর ঝলকানি। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস লালসালু। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। এটি বাংলা সাহিত্যের একটি আলোচিত উপন্যাস এবং একটি ধ্রুপদী সৃষ্টি। এই উপন্যাসকে বহুমাত্রিক ও কালোত্তীর্ণ উপন্যাস হিসেবে অভিহিত করা হয়। কবি আহসান হাবীব এটিকে বলেছিলেন তৎকালীন বাঙালি মুসলিম রচিত শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এটি ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় অনূদিত হয়। ইংরেজি অনুবাদের নাম Tree Without Roots ও ফরাসি অনুবাদের নাম Larbe sanse racines। ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন তাঁর স্ত্রী আন মেরি। এটি নবম- দশম শ্রেণিতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত ছিল। লালসালু হচ্ছে লাল কাপড়। এ উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় গ্রাম বাংলার মানুষের অশিক্ষা-কুশিক্ষা এবং ধর্মীয় ভণ্ডামির নিখুঁত চিত্র। এটি একটি সামাজিক সমস্যামূলক উপন্যাস। গ্রামবাসীর সরলতা ও ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীরা কিভাবে প্রতারণার জাল বিস্তার করে, ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষকে কিভাবে বিভ্রান্ত ও ভীতির মধ্যে রেখে শোষণের প্রক্রিয়া চালু রাখে এবং সমাজ বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে সমাজ থেকে ধর্ম ব্যবসা, ধর্মের নামে প্রচলিত কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও অন্ধত্ব দূর করা আর এসব অনাচার দূর করার একমাত্র হাতিয়ার হল আধুনিক শিক্ষা সেটিরই শিল্পরূপ পেয়েছে লালসালু উপন্যাসে।
তিনি তাঁর প্রতিটি গল্প, উপন্যাস ও নাটকে এভাবেই সমাজ বাস্তবতার নানান সমস্যা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত করেছেন এবং সেগুলো থেকে উত্তরায়ণের দিক নির্দেশনাও অত্যন্ত সফলভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর অন্যান্য রচিত গ্রন্থ চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪, উপন্যাস), কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮, উপন্যাস), দুই তীর ও অন্যান্য গল্প (ছোটগল্প, ১৯৬৫), নয়নচারা (গল্পসমগ্র, ১৯৪৬), বহ্নিপীর (নাটক,১৯৬০), উজানের মৃত্যু (নাটক, ১৯৬৬), তরঙ্গভঙ্গ (নাটক, ১৯৬৬), সুড়ঙ্গ (নাটক, ১৯৬৪) প্রভূতি। একটি তুলসী গাছের কাহিনী তাঁর লেখা বিখ্যাত গল্প। এটি একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬১), আদমজী সাহিত্য পুরষ্কার (১৯৬৫) অর্জন করেন।
তিনি ১৯৭১ সালের ১০ই অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন।
গতকাল ছিল বাংলাদেশের এই মহান কথাসাহিত্যিকের ৫২ তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর মৃত্যু দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
