
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি, বিনোদন সাংবাদিক :: আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম দিকপাল ও খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম এর ৮২তম জন্মদিন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তিনি এদেশের প্রথম সারির একজন নির্মাতা ছিলেন। তিনি এদেশে সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধ নির্ভর সবচেয়ে বেশি ছবি নির্মাণ করেন। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, সেলিনা হোসেন, রাবেয়া খাতুনের সাহিত্য কর্ম নিয়ে একাধিক ছবি নির্মাণ করেন। তাঁর ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ, গ্রাম বাংলার জীবন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, প্রেম বিরহ সংঘাত সুখ দুঃখ অত্যন্ত চমৎকারভাবে চিত্রায়িত করেছেন। তিনি মরমী কবি হাছন রাজার জীবন ও কর্ম নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তিনি ১৯৬১ সালে প্রখ্যাত অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক ফতেহ লোহানীর সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে আগমন করেন। পরবর্তীতে তিনি ওবায়েদ উল হক, সৈয়দ মোহাম্মদ আউয়াল, এসএম শফি প্রমুখদের মত পরিচালকদের সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। আসিয়া (৬১), দুই দিগন্ত (১৯৬৪), বালা (৬৬), অন্তরঙ্গ (৬৮), ছন্দ হারিয়ে গেল (৭২) প্রভৃতি ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনিই প্রথম মুক্তিযুদ্ধনির্ভর চলচ্চিত্র “ওরা ১১ জন” নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর নির্মিত কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলো হলো ওরা ১১ জন (১৯৭২), সংগ্রাম (১৯৭৪), দেবদাস (১৯৮২), চন্দ্রনাথ (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), মিয়া ভাই (১৯৮৭), হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭), হাছন রাজা (২০০১), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), শাস্তি (২০০৪), সুভা (২০০৫), ধ্রুবতারা (২০০৬) প্রভৃতি। তাঁর নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলো হলো ভালো মানুষ (১৯৭৫), বাজিমাত (১৯৭৮), লেডি স্মাগলার (১৯৮৬), বেহুলা লক্ষ্মিন্দর (১৯৮৭), বিরহ ব্যথা (১৯৮৮), মহাযুদ্ধ (১৯৮৮), বাসনা (১৯৮৯), দাঙ্গা ফাসাদ (১৯৯০), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১), আজকের প্রতিবাদ (১৯৯৫), শিল্পী (১৯৯৫), দুই পুরুষ (২০১১), দেবদাস (রঙ্গীন ২০১৪), অন্তরঙ্গ (২০১৫), ভুল যদি হয় (২০১৫) প্রভৃতি। তিনি তাঁর কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরষ্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। তাঁর মধ্যে ১৯৮৬ সালে শুভদা ও ১৯৯৭ সালে হাঙর নদী গ্রেনেড ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, জহির রায়হান স্বর্ণপদক (১৯৯৫), স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক (১৯৯৫) ও একুশে পদক (২০০৪) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির ৪ বারের মত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬৯ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর দেশের অন্যতম বিখ্যাত কাজী পরিবারের কে.জি আহমেদের মেয়ে জ্যোৎস্না কাজীকে বিয়ে করেন। তিনি তাঁর বাবা মায়ের বড় সন্তান ছিলেন। তাঁর বাবা মোসলেম উদ্দিন আহম্মদ ও মা শায়েস্তা খানম। তাঁর বাবা মোসলেম উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন ভারতের টাটা আয়রন এন্ড স্টীল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার৷ তাঁর মামা চাষী ইমাম উদ্দিন শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক এর সঙ্গে রাজনীতি করতেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম এর সঙ্গে নবযুগ ও লাঙল পত্রিকায় কাজ করতেন। তাঁর জন্মের সময়ে মামা চাষী ইমাম শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হককে তাঁর নাম রাখতে বলেন। তিনি তাঁর নাম রাখেন চাষী ইমাম থেকে চাষী ও কাজী নজরুল ইসলাম থেকে নজরুল ইসলাম নিয়ে চাষী নজরুল ইসলাম। শিক্ষাজীবনে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। তিনি ১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর বিক্রমপুর শ্রীনগর থানার সমষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৫ সালের ১১ই জানুয়ারি দীর্ঘদিন লিভার ক্যান্সারে ভুগে ঢাকা ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। জন্মদিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
