
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি– বৃষ্টি হচ্ছে। জানলার কাঁচে টুপটাপ শব্দ পড়ছে। ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে, অথচ আলোটা ম্লান হয়ে আছে। হয়তো টিউবলাইটটা পুরনো হয়ে গেছে, কিংবা বৃষ্টির দিনে সব আলো-ই কেমন নিস্তেজ লাগে।
নিশাত চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে বৃষ্টিকে খুব ভালোবাসে। ছোটবেলায় তার বিশ্বাস ছিল—বৃষ্টি আসলে আকাশের কান্না। আকাশ কাঁদে, তাই জল পড়ে। মা একদিন বলেছিলেন, বৃষ্টি মানে আশীর্বাদ। বৃষ্টি ছাড়া ফসল হয় না, নদী ভরে না, পুকুরে মাছ থাকে না। তখন থেকে নিশাত ঠিক করেছিল—সে বৃষ্টি মানে কান্না নয়, আশীর্বাদই ভাববে। কিন্তু যত বড় হয়েছে, ততই মনে হয়েছে—বৃষ্টির মধ্যে এক ধরনের হাহাকার আছে।
আজকের বৃষ্টি যেন সেই হাহাকারেই ভরা। নিশাত জানালার কাঁচে হাত রাখে। শীতল কাঁচটা তার তালু ঠান্ডা করে দেয়। বাইরে রাস্তাটা ফাঁকা। মাঝে মাঝে দু’একটা রিকশা যায়। ছাতার নিচে দ্রুত হাঁটছে মানুষ। সবকিছুই কেমন তাড়াহুড়া।
কিন্তু সেই তাড়াহুড়ার ভেতরেই হঠাৎ তার চোখে পড়ল একজন মানুষ। লোকটা ছাতা নেয়নি। ভিজতে ভিজতে হাঁটছে। শরীর ভিজে একাকার, তবু কোনো তাড়া নেই। মাথা একটু নীচু করে হাঁটছে, যেন বৃষ্টি তাকে ঢেকে রাখছে। নিশাত হঠাৎ চমকে ওঠে—কেন জানি মনে হয় লোকটাকে সে চেনে। অথচ তার স্মৃতিতে এমন কাউকে মনে পড়ছে না। লোকটা রাস্তার মাঝামাঝি এসে দাঁড়িয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে চারপাশ তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। নিশাতের বুক কেঁপে উঠল—এই মানুষটা আসলে কে? ঘরে ফিরে এসে নিশাত খেয়াল করল, তার ছোট ভাই নিলয় বসে মোবাইল গেম খেলছে। — দ্যাখছিস বাইরে কেমন বৃষ্টি? নিশাত বলল। নিলয় মাথা না তুলে বলল, — হুঁ। — কেউ ভিজতে ভিজতে হাঁটছে রাস্তায়। ছাতা ছাড়া। — তাই নাকি? পাগল হইছে হয়তো। নিশাত হাসতে পারল না। অদ্ভুত এক শিহরণ তার শরীরে রয়ে গেল। রাত নামল। বৃষ্টির শব্দ থামেনি। নিশাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে বারবার ভাবতে থাকল সেই মানুষটার কথা। কে হতে পারে? কেনই বা তার মনে হচ্ছে মানুষটাকে চেনে? ঘুম এল না। সে ঘড়ি দেখল—রাত দুইটা। হঠাৎ দরজায় কেমন যেন শব্দ হলো। হালকা কড়া নাড়ার মতো। নিশাত চমকে উঠল। সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল। বাইরে গিয়ে দেখল—কেউ নেই। শুধু বারান্দায় ভিজে ভিজে জল পড়ছে। নিশাতের বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ। সে ভয় পেতে শুরু করল। ফিরে এসে বিছানায় শুল, কিন্তু ঘুম আর এল না। পরদিন সকাল। বৃষ্টি নেই। আকাশ পরিষ্কার। নিশাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে রোদে চোখ মেলল। এমন শান্ত সকাল মনে হচ্ছিল অনেকদিন পর এল। তবু মনে ভেতরটা শান্ত নয়। সে বাইরে গিয়ে বাজার করল। বাজার থেকে ফেরার সময় আবার চোখে পড়ল সেই মানুষটাকে। দূরে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে। একইভাবে ভিজে শরীর, যদিও আজ বৃষ্টি নেই। এবার নিশাত থমকে দাঁড়াল। স্পষ্ট দেখা গেল—মানুষটা তাকিয়ে আছে তার দিকেই। নিশাতের বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু সে আবার চোখের পলক ফেলতেই লোকটা নেই। যেন মিলিয়ে গেছে। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। নিশাত বারবার সেই মানুষটাকে দেখছে। কখনো বৃষ্টিতে, কখনো রোদে। কখনো খুব কাছে, কখনো দূরে। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়—লোকটা তাকে চেনে। এক রাতে নিশাত স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নে সে হাঁটছে ভিজে মাঠের ভেতর দিয়ে। দূরে একজন দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখে—সেই মানুষটা। ভিজে চুল, ভিজে জামা। মুখটা অদ্ভুতভাবে পরিচিত। নিশাত ডাকতে গেল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হল না। ঘুম ভাঙল ভোরবেলায়। নিশাতের শরীর ভিজে গেছে ঘামে। নিলয় একদিন হেসে বলল, — আপু, তুমি না সিনেমার মতো কাহিনি বানাইতেছ। কেউ তোমারে ফলো করছে না। নিশাত বলল, — কিন্তু আমি তো বারবার দেখছি। — স্বপ্নে দ্যাখো আর মনে হয় দ্যাখছ। পড়াশোনার চাপ আছে, তাই এসব হচ্ছে। নিশাত কিছু বলল না। হয়তো নিলয় ঠিকই বলছে। কিন্তু বুকের ভেতর যেটা হচ্ছে, সেটা অস্বীকার করা যায় না। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। বাইরে আবার বৃষ্টি নামল।
নিশাত মোমবাতি জ্বালাল। জানলার বাইরে তাকাতেই দেখে—সেই মানুষটা বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। এবার স্পষ্ট। এ আর কোনো কল্পনা নয়। ভিজে মানুষটা তাকিয়ে আছে তার দিকে। নিশাতের মনে হলো, মানুষটার চোখে এক ধরনের বিষণ্ণতা আছে। এমন চোখ সে আগে কোনোদিন দেখেনি। হঠাৎ মানুষের ঠোঁট নড়ল। নিশাত কিছুই শুনতে পেল না। কিন্তু ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে বুঝল—মানুষটা বলছে, “আমি এসেছি।” নিশাত ভয়ে জানলা থেকে সরে এল। বুকের ভেতর দম আটকে আসছে। পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল—এই রহস্যের শেষ দেখতে হবে। মানুষটা কে? কেন বারবার আসছে? নিশাত পাড়ার এক বৃদ্ধার কাছে গেল। বৃদ্ধা বললেন, — মেয়ে, এ রাস্তায় মাঝে মাঝে এক ছেলেকে দেখা যায়। বছর দশেক আগে এ পাড়ায় থাকত। একদিন বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে যায়, তারপর আর ফেরেনি। শুনেছি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তবে কেউ কেউ বলে—সে নাকি এখনও ভিজে ভিজে রাস্তায় হাঁটে। নিশাতের শরীর কাঁপতে লাগল। সেদিন রাতে নিশাত ঠিক করল, যদি মানুষটা আবার আসে—সে ডাকবে। এবং সত্যিই, বৃষ্টি নেমে এলো। জানলার কাঁচে জল ঝরতে লাগল। সেই মানুষটা এসে দাঁড়াল। নিশাত এবার সাহস করে জানলা খুলে বলল, — আপনি কে? মানুষটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। মুখে এক ধরনের ব্যথার হাসি।
— আমি কেউ না। আমি শুধু ভিজে থাকি। — আপনি বারবার আসেন কেন? — কারণ তুমি আমাকে দেখ। আর কেউ দেখে না। নিশাতের বুক কেঁপে উঠল। — আমি কী করব? মানুষটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, — শুধু মনে রেখো, বৃষ্টি মানেই কান্না নয়। এটা আশীর্বাদও হতে পারে। এই বলে মানুষটা মিলিয়ে গেল। নিশাত চমকে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর থেকে নিশাত আর সেই মানুষটাকে দেখেনি। তবে বৃষ্টি নামলেই সে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। ভিজে কাঁচে হাত রাখে। মনে মনে ভাবে—বৃষ্টি শুধু কান্না নয়, সত্যিই আশীর্বাদ। হয়তো সেই মানুষটা তার ভেতরে কোথাও থেকে গেছে। হয়তো বৃষ্টির মতোই, যে আসে-যায়, কিন্তু ফেলে যায় এক অদ্ভুত স্মৃতি।
“সমাপ্তি”