
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে চিত্রগ্রহণ (cinematography) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পভাগ। এই শাখায় যাঁরা পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বেবী ইসলাম। তিনি শুধু একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহকই নন, বরং একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, আলোকচিত্রী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও সুপরিচিত। তাঁর কাজ বাংলা চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়তা করেছে।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবনঃ বেবী ইসলামের প্রকৃত নাম ছিল আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকাল থেকেই তিনি শিল্প ও চিত্রকলার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সিলদাহর একটি মিশনারি স্কুলে এবং পরে ক্যাথেড্রাল মিশন হাই স্কুলে সম্পন্ন হয়। ১৯৪৫ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন এবং পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বঙ্গবাসী কলেজে পড়াশোনা করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইতালিতেও অধ্যয়ন করেন—যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা প্রদান করে।
চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশঃ বেবী ইসলামের চলচ্চিত্রজীবনের শুরু হয় কলকাতার বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা অজয় কর–এর সহকারী হিসেবে। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকায় এসে তথ্য বিভাগে সিনিয়র ফটোগ্রাফার হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (FDC)-এর মহাব্যবস্থাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় থেকেই তিনি চলচ্চিত্রে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। চিত্রগ্রাহক হিসেবে কর্মজীবনঃ বেবী ইসলাম বাংলা চলচ্চিত্রে আলোকচিত্রের নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর ক্যামেরা ব্যবহারে ছিল বাস্তবতা, নান্দনিকতা এবং গভীর আবেগের সমন্বয়।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহঃ তিনি যেসব চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: তিতাস একটি নদীর নাম, যুক্তি তক্কো আর গপ্পো, আকাশ আর মাটি, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, নীল আকাশের নিচে, সূর্যস্নান, এতটুকু আশা। তিনি ভারতের প্রখ্যাত নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক–এর সঙ্গেও কাজ করেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। তাঁর চিত্রগ্রহণে গ্রামীণ জীবন, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানবিক আবেগ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠত।
পরিচালক হিসেবে অবদানঃ চিত্রগ্রহণের পাশাপাশি বেবী ইসলাম চলচ্চিত্র পরিচালনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র: চরিত্রহীন, তানহা। বিশেষ করে চরিত্রহীন চলচ্চিত্রটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পুরস্কার ও সম্মাননাঃ বেবী ইসলাম তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য বহু পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭৫ সালে চরিত্রহীন চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক) লাভ করেন। এছাড়া তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ২০০৯ সালে তিনি Meril-Prothom Alo Lifetime Achievement Award পান।
আলোকচিত্র ও অন্যান্য অবদানঃ চলচ্চিত্রের বাইরে বেবী ইসলাম একজন দক্ষ আলোকচিত্রী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর তোলা ছবি বিভিন্ন বই ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এছাড়া মানবসেবামূলক কাজের অংশ হিসেবে তিনি একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন, যা তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচায়ক। ব্যক্তিগত জীবনঃ বেবী ইসলামের স্ত্রীর নাম ছিল তন্দ্রা ইসলাম। তাঁদের পরিবারেও সাংস্কৃতিক চর্চার ধারা অব্যাহত ছিল।
মৃত্যুঃ ২০১০ সালের ২৪ মে ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হয়। মূল্যায়নঃ বেবী ইসলাম বাংলা চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রহণকে একটি শিল্পরূপে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: বাস্তবধর্মী ভিজ্যুয়াল নির্মাণ। আলো-ছায়ার সৃজনশীল ব্যবহার। মানবিক আবেগের সূক্ষ্ম উপস্থাপন। সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রে নান্দনিক চিত্রগ্রহণ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যাঁরা পরবর্তীতে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর কাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।
শেষ কথাঃ বেবী ইসলাম শুধু একজন চিত্রগ্রাহক নন, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর ক্যামেরা বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে যে গভীরতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলে ধরেছে, তা আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।