
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রহণকে শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করা যে ক’জন মানুষের হাত ধরে সম্ভব হয়েছিল, তাঁদের অন্যতম ছিলেন রফিকুল বারী চৌধুরী। তিনি ১৯৩০ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। চলচ্চিত্রের ফ্রেম, আলো, ছায়া ও বাস্তবতার নান্দনিক ব্যবহারে তিনি নির্মাণ করেছিলেন নিজস্ব ভাষা। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা চলচ্চিত্রের এই নীরব কারিগরকে স্মরণ করছে চলচ্চিত্রাঙ্গন।
রফিকুল বারী চৌধুরী ছিলেন একাধারে সিনেমাটোগ্রাফার, পরিচালক, প্রযোজক ও গল্পকার। দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশের মূলধারার ও শিল্পধারার চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। চলচ্চিত্রে ক্যামেরার ব্যবহারকে কেবল প্রযুক্তিগত কাজ হিসেবে নয়, বরং গল্প বলার এক গভীর মাধ্যম হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
চলচ্চিত্র জগতে তাঁর কাজের পরিধি ছিল বিস্তৃত। চিত্রগ্রাহক হিসেবে তিনি বহু আলোচিত চলচ্চিত্রে কাজ করেন এবং তাঁর ক্যামেরাবন্দি দৃশ্য নির্মাণ দর্শকদের মনে আলাদা আবহ তৈরি করত। তাঁর চিত্রগ্রহণে বাস্তবতা, আবেগ ও নান্দনিকতার মিশ্রণ বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই গুণী শিল্পী বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন দীর্ঘ সময় ধরে।
পরিচালক হিসেবেও রফিকুল বারী চৌধুরী ছিলেন স্বতন্ত্র। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রে সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক টানাপোড়েন এবং মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট উঠে এসেছে সংবেদনশীল ভঙ্গিতে। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র পেনশন বিশেষভাবে আলোচিত হয়। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা। ছবিটিতে আরো অভিনয় করেন আনোয়ার হোসেন, রওশন জামিল ও সোহেল রানা। চলচ্চিত্রটি আজও দর্শকের স্মৃতিতে মানবিক আবেগের এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।
তিনি ভুল যখন ভাঙ্গলো, চন্ডীদাস ও রজনকিনী ও তানসেন চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এছাড়া সতীনের সংসার চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসেবেও তাঁর নাম উল্লেখযোগ্য। চিত্রগ্রাহক হিসেবে গোলাপী এখন ট্রেনে, দুই পয়সার আলতা, হীরামতি, জয়যাত্রা, নসিমন, মনের মাঝে তুমিসহ বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তিনি কাজ করেছেন।
তিনি চারবার শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন।
২০০৫ সালের ৮ মে ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলোকচিত্রময় চলচ্চিত্রভাষা আজও বাংলাদেশের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে যাঁরা নেপথ্যে থেকে শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন, রফিকুল বারী চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। তাঁর ক্যামেরার চোখে ধরা পড়া মানুষের জীবন, আবেগ ও সময় আজও বাংলা চলচ্চিত্রের মূল্যবান সম্পদ হয়ে আছে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।