
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনয়ভুবনে যেসব শিল্পী নিজেদের স্বতন্ত্র অভিনয়ভঙ্গি, সংলাপ উচ্চারণ ও চরিত্র নির্মাণের দক্ষতায় স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন বিকাশ রায়। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী বাংলা চলচ্চিত্রের এক স্বর্ণযুগকে নতুন করে স্মরণ করার উপলক্ষ এনে দেয়। ১৯৮৭ সালের ১৬ এপ্রিল কলকাতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে তিনি বাংলা সিনেমায় অভিনয়ের যে ধারা নির্মাণ করেছিলেন, তা এখনও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আলোচনায় ফিরে আসে।
১৯১৬ সালের ১৬ মে কলকাতায় জন্ম নেওয়া বিকাশ রায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বেড়ে ওঠেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য, নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। চলচ্চিত্রে আসার আগে তিনি বেতার ও মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে পরিচালক হেমেন গুপ্তের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথমদিকের কাজের মধ্যেই অভিনয়ের স্বাভাবিকতা ও সংযত অভিব্যক্তি দর্শকের নজর কাড়ে।
বাংলা চলচ্চিত্রের পরিবর্তনশীল সময়ে বিকাশ রায় ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ। পৌরাণিক ও অতিনাটকীয় অভিনয়ের বাইরে এসে তিনি বাস্তবধর্মী অভিনয়কে জনপ্রিয় করে তুলতে ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে পারিবারিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অসাধারণ। কঠোর অথচ মানবিক পিতার চরিত্র, দ্বিধাগ্রস্ত মধ্যবিত্ত মানুষ কিংবা সমাজ-সচেতন ব্যক্তিত্ব—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজস্ব অভিনয়ভাষা তৈরি করেছিলেন।
অভিনেতা হিসেবেই নয়, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও বিকাশ রায় কাজ করেছেন। তিনি নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হন। বাংলা সিনেমার নান্দনিক পরিবর্তনে তাঁর অবদান চলচ্চিত্র গবেষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘৪২’, ‘ভুলি নাই’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘আরোহী’, ‘কাঁচনজঙ্ঘা’ সহ আরও বহু জনপ্রিয় সিনেমা। তিনি বাণিজ্যিক ও শিল্পধর্মী—দুই ধারার চলচ্চিত্রেই সমান দক্ষতায় কাজ করেছেন। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং গভীর দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রে আলাদা মাত্রা এনে দেয়।
মঞ্চনাটকের প্রতিও তাঁর টান ছিল প্রবল। চলচ্চিত্রের ব্যস্ততার মধ্যেও দীর্ঘ সময় থিয়েটারে কাজ করেছেন। অভিনয়কে তিনি কেবল পেশা হিসেবে নয়, শিল্পচর্চা হিসেবে দেখতেন। এই দায়বদ্ধতাই তাঁকে সমকালীন অনেক অভিনেতার চেয়ে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্মরণ করেন এক নিবেদিত শিল্পীকে, যিনি অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের অন্তর্জগতকে রূপালি পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন। সময় বদলেছে, চলচ্চিত্রের ভাষাও পাল্টেছে; কিন্তু বিকাশ রায়ের অভিনয়ের গভীরতা এখনও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অনিবার্য অধ্যায় হয়ে আছে।