
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়, জনপ্রিয় ও বহুমাত্রিক অভিনয়শিল্পী আনিসুর রহমান মিলন—যিনি দর্শকের কাছে শুধুই “মিলন” নামেই বেশি পরিচিত—আজ তাঁর জন্মদিন।
আনিসুর রহমান মিলনের জন্ম ৩ জুন ১৯৭৪ সালে, ঢাকায়। বর্তমানে তাঁর বয়স ৫২ বছর। তিনি একজন অভিনেতা, প্রযোজক এবং টিভি উপস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি অভিনয়জগতে সক্রিয় আছেন।
শৈশব থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ গড়ে ওঠে এবং খুব অল্প বয়সেই তিনি মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে সেই আগ্রহই তাঁকে বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করে। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি “আর্তনাদ থিয়েটার”-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয় জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিলের ডেমোক্রেসি ওয়াচ প্রকল্পে কাজ করেন এবং কিছু সময় একটি ব্যাংকে চাকরিও করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে অভিনয়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এই পর্যায়ে তাঁর অভিনয় দক্ষতা আরও পরিপক্ব হতে থাকে, যা পরে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে।
সালাউদ্দিন লাভলু পরিচালিত চ্যানেল আইয়ের ধারাবাহিক নাটক “রঙের মানুষ”-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথম ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এই নাটকের জন্য তিনি ইউরো সিজেএফবি পারফরম্যান্স পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৬ সালে “মধুময়রা” টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করে তিনি সমালোচক শাখায় মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে সেরা টিভি অভিনেতা নির্বাচিত হন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের একটি বড় অর্জন। এরপর তিনি একাধিক জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করেন, যার মধ্যে রয়েছে—“১১১: এ নেলসন নাম্বার”, “জয়িতা”, “প্রজাপতিকাল”, “হাটকুড়া”, “অতঃপর”, “ফাইভ স্টার মেস”, “মিলার বারান্দা”, “জীবনের অলিগলি” প্রভৃতি।
আনিসুর রহমান মিলনের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে ২০০৫ সালে সুচন্দা পরিচালিত “হাজার বছর ধরে” চলচ্চিত্রে, যেখানে তিনি করিম শেখ নামের একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। ২০০৮ সালে তিনি “দ্য লাস্ট ঠাকুর” চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এবং বড় পর্দায় নিজের অবস্থান তৈরি করেন। পরবর্তী দশকে তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রে কাজ করেন, যেমন—দেহরক্ষী (২০১৩), পোড়ামন (২০১৩), লালচর (২০১৫), রাজনীতি (২০১৭), ক্রাইম রোড (২০১৭), আলতা বানু (২০১৮), রাত্রির যাত্রী (২০১৯) প্রভৃতি। বিশেষ করে “রাজনীতি” চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়, যেখানে তিনি চরিত্রে রূপান্তরের দক্ষতা ও গভীর অভিনয়শৈলী প্রদর্শন করেন।
তিনি বর্তমানে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন—উভয় মাধ্যমেই সক্রিয়। তাঁর বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে, যেমন—“সাদাকালো প্রেম”, “রাত্রির যাত্রী”, “মন জ্বলে”, “টার্গেট”, “স্বপ্নবাড়ি” ইত্যাদি। এছাড়া নতুন চলচ্চিত্র “আলতা বানু”-তে তিনি রানা চরিত্রে অভিনয় করছেন, যেখানে তাঁর বিপরীতে রয়েছেন জাকিয়া বারী মম।
আনিসুর রহমান মিলনের ব্যক্তিগত জীবনও নানা আলোচনার অংশ হয়েছে। তিনি ১৯৯৯ সালে লুসি গোমেজকে বিয়ে করেন এবং ২০১৩ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তাদের একটি ছেলে রয়েছে, নাম মিহ্রান রহমান। পরবর্তীতে তিনি পলি আহমেদকে বিয়ে করেন, যিনি ২০২২ সালে ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। ২০২৪ সালে তিনি শিপার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
তাঁর ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পুরস্কার ও স্বীকৃতি হলো—ইউরো সিজেএফবি পারফরম্যান্স পুরস্কার, আরটিভি সিজেএফবি পারফরম্যান্স পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার (সেরা টিভি অভিনেতা, সমালোচক বিভাগ), আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ড মনোনয়ন, বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন সম্মাননা প্রভৃতি।
মিলনের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর চরিত্রভিত্তিক বৈচিত্র্য। তিনি একদিকে গ্রামীণ বাস্তবধর্মী চরিত্র, অন্যদিকে অ্যাকশন ও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের চরিত্রে সমান দক্ষতায় অভিনয় করতে সক্ষম। থিয়েটার থেকে উঠে আসার কারণে তাঁর অভিনয়ে স্বাভাবিকতা ও গভীরতার বিশেষ ছাপ পাওয়া যায়।
আনিসুর রহমান মিলন বাংলাদেশের অভিনয় জগতে একজন পরিশ্রমী, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘসময় ধরে সক্রিয় শিল্পী। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—এই তিন মাধ্যমেই তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভকামনা, তাঁর সৃজনশীল যাত্রা আরও দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ হোক।