
নওগাঁ প্রতিনিধি: ঈদ-উল-আজহা উপলক্ষে ইসলামিক রিলিফ ইউএসএ’র অর্থায়নে নওগাঁ জেলায় সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে কুরবানীর মাংস বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম মাংস পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপকারভোগীরা। পাশাপাশি গরু ক্রয় ও মাংস বিতরণ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, ইসলামিক রিলিফ ইউএসএ’র অর্থায়নে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সোশ্যাল এইড’-এর বাস্তবায়নে নওগাঁ জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ২৬টি কুরবানীর গরু ক্রয় করা হয়। এসব গরুর মাংস নওগাঁ সদর, রানীনগর, মান্দা, মহাদেবপুর ও পত্নীতলা উপজেলার ২ হাজার ৮০ জন অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মাঝে বিতরণের কথা ছিল। প্রত্যেক পরিবারকে ২ কেজি করে মাংস দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ঈদের দিন থেকে তৃতীয় দিন পর্যন্ত (২৮-৩০ মে) নির্ধারিত কার্ডধারীদের মাঝে মাংস বিতরণ করা হয়। এ লক্ষ্যে আগে থেকেই সুবিধাভোগীদের মধ্যে কার্ড বিতরণ করা হয়েছিল। কার্ড নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই নওগাঁ সদর উপজেলা চত্বরে উপস্থিত হন।
উপকারভোগীদের অভিযোগ, সকাল ১০টা থেকে অপেক্ষা করেও অনেককে বিকেল পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। অথচ মাংস বিতরণের সময় কেউ পেয়েছেন ১ কেজি ৯০০ গ্রাম, কেউ ১ কেজি ৬০০ গ্রাম, আবার কেউ পেয়েছেন মাত্র ১ কেজি বা ১ কেজি ৪০০ গ্রাম মাংস।
নওগাঁ সদর উপজেলার দুবলহাটি ইউনিয়নের মাতাসাগর গ্রামের বৃদ্ধা বুলবুলি বলেন, “আমাকে ২ কেজি মাংস দেওয়ার কথা বলে কার্ড দেওয়া হয়েছিল। ৫০ টাকা ভাড়া খরচ করে উপজেলা সদরে এসেছি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আমাকে একটি প্যাকেট দিয়ে বলা হয়েছে, আপনার ভাগ্যে ১ কেজি আছে, এটা নিয়ে যান।”
রানীনগর উপজেলার গোনা গ্রামের আরিফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের বাড়ি অনেক দূরে। যাতায়াতে প্রায় ১৭০ টাকা ভাড়া লাগে। চারটি কার্ড নিয়ে এসেছিলাম। আমার মাংসের ওজন হয়েছে ১ কেজি ৭০০ গ্রাম এবং ভাইয়েরটা ১ কেজি ৬০০ গ্রাম। অন্য দুইজনের কার্ডে মাংস দিতে অনুরোধ করলেও তারা দেয়নি।”
একই উপজেলার বরবরিয়া গ্রামের নাছিমা বলেন, “আগে কখনও এমন সহায়তা পাইনি। কার্ড নিয়ে এসে মাংস পেয়েছি, কিন্তু ওজন করে দেখি ১ কেজি ৪০০ গ্রাম।”
মাংস ওজনের দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবী মর্জিনা বেগম জানান, অধিকাংশ প্যাকেটে ১ কেজি ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৯০০ গ্রাম পর্যন্ত মাংস ছিল। বড় পিসের কারণে ওজন সমন্বয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। তবে কোনো প্যাকেটে মাত্র ১ কেজি মাংস ছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রকল্প সমন্বয়কারী ও বেসরকারি সংস্থা ‘রানি’র প্রধান নির্বাহী ফজলুল হক খাঁন বলেন, “২৬টি গরুর মাংস জেলার পাঁচটি উপজেলার দরিদ্র ও দুস্থ পরিবারের মাঝে জনপ্রতি ২ কেজি করে বিতরণ করা হয়েছে। কোথাও সামান্য কম-বেশি হতে পারে, তবে ৫০০ গ্রাম, ৭০০ গ্রাম বা ১ কেজি কম দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।” তবে প্রকল্পের মোট বরাদ্দের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নওগাঁ জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, “এটি কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প। উপকারভোগীদের কাছ থেকে মাংস কম পাওয়ার অভিযোগ এসেছে। গরু ক্রয় ও মাংস বিতরণে অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাংস বিতরণে ওজনে কম দেওয়ার বিষয়ে একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা প্রত্যয়ন নিতে এলে বিষয়টি তাদের জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে বলা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, পুরো কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গরু ক্রয়, মাংস সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রক্রিয়া তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।