
চলচ্চিত্র সাংবাদিকঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বাংলাদেশের সমসাময়িক চলচ্চিত্রে গ্রামীণ সমাজ, লোকজ সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি হলো Mrittika Maya। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা, কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন Gazi Rakayet। ২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে, কারণ এটি গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা এবং মানুষের ঐতিহ্যবাহী পেশার সংকটকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে। ২০১২ সালে সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘মৃত্তিকা মায়া’ নির্মাণে প্রযোজক হিসেবে যুক্ত ছিলেন গাজী রাকায়েত ও ফরিদুর রেজা সাগর। চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা ও পরিবেশনা করেছে Impress Telefilm Limited। এতে অভিনয় করেছেন Raisul Islam Asad, Titas Zia, Shormi Mala, Aparna Ghosh, Mamunur Rashid, Pijush Bandhopadhyay, Lutfur Rahman George, Wahida Mollik Jolly প্রমুখ। ছবিটির সঙ্গীত পরিচালনা করেন AK Azad এবং চিত্রগ্রহণ করেন Saiful Islam Badal। নির্মাণ প্রেক্ষাপটঃ ‘মৃত্তিকা মায়া’ চলচ্চিত্রটি মূলত বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের এক ঐতিহ্যবাহী পেশা—মৃৎশিল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
গ্রামবাংলার কুমোর সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে মাটির তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাবে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। পরিচালক গাজী রাকায়েত এই সামাজিক বাস্তবতাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি একজন মঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনেতা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার পর এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রটি নির্মাণে তিনি নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থ বিনিয়োগও করেন বলে বিভিন্ন চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কাহিনির সারাংশঃ ‘মৃত্তিকা মায়া’ চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয়েছে খিরমোহন নামের এক বৃদ্ধ কুমোরকে কেন্দ্র করে। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন Raisul Islam Asad। খিরমোহন সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করে নিজের একটি মৃৎশিল্পের কারখানা গড়ে তুলেছেন। এই কারখানা এবং তার পাশে একটি বটগাছই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনে নতুন সংকট দেখা দেয়। তার দুই ছেলে শহরে বসবাস করে এবং তারা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পেশার প্রতি আগ্রহী নয়। তারা বাবার গড়ে তোলা মৃৎশিল্পের ব্যবসা বিক্রি করে আর্থিক লাভ করতে চায়। খিরমোহনের জীবনে কিছুটা আশার আলো হয়ে আসে তার নাতনি পদ্মা এবং পালকপুত্র বৈশাখ।
পদ্মা গ্রামেই থাকে এবং দাদার প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করে। অন্যদিকে বৈশাখ ছোটবেলা থেকে খিরমোহনের আশ্রয়ে বড় হয়েছে এবং সে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চলচ্চিত্রের কাহিনি এগিয়ে যায় এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে—একদিকে আধুনিক নগরজীবনের আকর্ষণ, অন্যদিকে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষার সংগ্রাম। বৈশাখ এবং পদ্মা চেষ্টা করে খিরমোহনের স্বপ্ন ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে। কিন্তু গ্রামের রাজনীতি, লোভ এবং সামাজিক চাপ তাদের এই সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তোলে। চরিত্র ও অভিনয়ঃ চলচ্চিত্রটির অন্যতম শক্তি হলো এর শক্তিশালী অভিনয়। Raisul Islam Asad অভিনীত খিরমোহন চরিত্রটি অত্যন্ত বাস্তব ও আবেগঘনভাবে ফুটে উঠেছে। তার অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক একজন বৃদ্ধ কুমোরের জীবনসংগ্রাম ও মানসিক যন্ত্রণাকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারে। Titas Zia অভিনীত বৈশাখ চরিত্রটি চলচ্চিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৈশাখ একজন সংগ্রামী যুবক, যে ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রতীক। Shormi Mala অভিনীত পদ্মা চরিত্রটিও চলচ্চিত্রে একটি আবেগঘন মাত্রা যোগ করেছে। নির্মাণশৈলী ও নান্দনিকতাঃ ‘মৃত্তিকা মায়া’ চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলী বাস্তবধর্মী ও শিল্পসম্মত। পরিচালক এখানে গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক পরিবেশকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্রটির দৃশ্যায়নে গ্রামবাংলার মাটির ঘর, কুমোরের চাকা, নদী, মাঠ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এর মাধ্যমে দর্শক যেন গ্রামীণ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এছাড়া চলচ্চিত্রটির সঙ্গীত ও শব্দব্যবহার গল্পের আবেগকে আরও গভীর করেছে। লোকজ সুর এবং প্রাকৃতিক শব্দ চলচ্চিত্রটির পরিবেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পুরস্কার ও স্বীকৃতিঃ ‘মৃত্তিকা মায়া’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অন্যতম সফল পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র।
২০১৩ সালের বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এটি মোট ১৭টি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে, যা একটি রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাফল্য অর্জন করে। শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত SAARC Film Festival-এ চলচ্চিত্রটি রৌপ্য পদক লাভ করে। উপসংহারঃ সব দিক বিবেচনায় ‘মৃত্তিকা মায়া’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পধর্মী চলচ্চিত্র। এটি শুধু একটি কুমোর পরিবারের গল্প নয়; বরং এটি গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন, ঐতিহ্যের সংকট এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতীকী উপস্থাপন। পরিচালক গাজী রাকায়েত অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখিয়েছেন যে আধুনিকতার চাপে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা বিলুপ্তির মুখে পড়ছে। তবুও কিছু মানুষ এখনও সেই ঐতিহ্য রক্ষার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এই অর্থে ‘মৃত্তিকা মায়া’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনসংগ্রামের একটি শক্তিশালী শিল্পসম্মত দলিল।