
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলা চলচ্চিত্রের ব্যঙ্গধর্মী ও চিন্তাশীল নির্মাতাদের মধ্যে অন্যতম নাম ছিল অনীক দত্ত। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে টলিউডজুড়ে। ২০২৬ সালের ২৭ মে কলকাতার গড়িয়াহাট এলাকার একটি বহুতলের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ঘটনাটি ঘিরে এখনো রহস্য রয়ে গেছে এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
প্রাথমিক খবরে জানা যায়, হিন্দুস্তান পার্ক এলাকার বহুতলের ছাদ থেকে পড়ে যান অনীক দত্ত। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে দ্রুত ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ঘটনাস্থলে কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড শাখাও পৌঁছায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
টলিউডে অনীক দত্ত পরিচিত ছিলেন তাঁর স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রভাষা, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ এবং সামাজিক পর্যবেক্ষণের জন্য। ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর আলোচিত চলচ্চিত্র ভূতের ভবিষ্যৎ তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ছবিটি কেবল ভৌতিক কমেডি ছিল না; বরং সময়, সমাজ, সংস্কৃতি ও নগরজীবনের উপর এক ব্যতিক্রমী ব্যঙ্গাত্মক ভাষ্য হিসেবেও দর্শকদের কাছে সমাদৃত হয়। এরপর তিনি নির্মাণ করেন আশ্চর্য প্রদীপ, মেঘে ঢাকা তারা, বরুণবাবুর বন্ধু এবং অপরাজিত-এর মতো উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। বিশেষ করে “অপরাজিত” চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রশংসিত হয়েছিল। সিনেমাটিতে তিনি একদিকে যেমন সত্যজিৎ রায়-এর সৃষ্টিশীল সংগ্রামের আবহ তুলে ধরেন, অন্যদিকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও শিল্পচর্চাকেও নতুনভাবে আলোচনায় আনেন।
অনীক দত্তের চলচ্চিত্রে ছিল সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সূক্ষ্ম মিশ্রণ। তাঁর নির্মাণশৈলীতে একদিকে যেমন রসবোধ ছিল, অন্যদিকে ছিল গভীর মানবিকতা ও আত্মসমালোচনার সুর। বাংলা মূলধারার চলচ্চিত্রে তিনি ব্যতিক্রমী ভাষা ও বিষয়বস্তুর মাধ্যমে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর খবরে টলিউডের বহু শিল্পী, নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী শোক প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হাসপাতালে তাঁর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং অভিনেতা জিতু কমল।
বাংলা চলচ্চিত্রে ব্যঙ্গ, ইতিহাসচেতনা ও মননশীলতার যে স্বতন্ত্র ধারা অনীক দত্ত তৈরি করেছিলেন, তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থান সেই ধারার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকবে।