
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুনীল দত্ত এমন একজন জনপ্রিয় অভিনেতার নাম, তিনি ছিলেন মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শিল্পসচেতনতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ২০০৫ সালের ২৫ মে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুম্বাইয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র হারিয়েছিল এক কিংবদন্তিকে, আর দর্শক হারিয়েছিল এমন একজন শিল্পীকে যিনি পর্দার বাইরেও ছিলেন অসাধারণ এক মানুষ।
১৯২৯ সালের ৬ জুন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের ঝেলম জেলায় (বর্তমানে পাকিস্তানে) জন্মগ্রহণ করেন সুনীল দত্ত। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বলরাজ দত্ত। দেশভাগের পর পরিবারসহ ভারতে চলে আসেন তিনি। কলেজ জীবন শেষে রেডিও সিলোনে ঘোষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে Railway Platform চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। তবে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৫৭ সালে Mother India চলচ্চিত্রে। ছবিতে বিদ্রোহী পুত্র ‘বিরজু’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। এই চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় আগুনের দুর্ঘটনা থেকে অভিনেত্রী Nargis-কে বাঁচানোর ঘটনা পরবর্তীতে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। এরপর দুজনের প্রেম এবং ১৯৫৮ সালে বিবাহ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে।
ষাট ও সত্তরের দশকে সুনীল দত্ত একের পর এক স্মরণীয় চলচ্চিত্র উপহার দেন। Sujata, Mujhe Jeene Do, Waqt, Khandan, Padosan কিংবা Reshma Aur Shera— প্রতিটি ছবিতেই তিনি নিজস্ব অভিনয়ভঙ্গি দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। বিশেষ করে Mujhe Jeene Do ও Khandan ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেন।
তিনি শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও তিনি ছিলেন সফল। Yaadein চলচ্চিত্রটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী পরীক্ষা হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রায় পুরো ছবিতেই একাই অভিনয় করেছিলেন তিনি। আবার Reshma Aur Shera চলচ্চিত্রে রাজস্থানের মরুভূমির পটভূমিতে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক কাব্যিক ট্র্যাজেডি।
ব্যক্তিজীবনে সুনীল দত্ত ছিলেন গভীর মানবিক চেতনার অধিকারী। স্ত্রী নার্গিস ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নার্গিস দত্ত ফাউন্ডেশন’, যা ক্যান্সার রোগীদের সহায়তায় কাজ করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তির বার্তা নিয়ে তিনি মুম্বাই থেকে অমৃতসর পর্যন্ত পদযাত্রাও করেছিলেন।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি সক্রিয় রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে একাধিকবার লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হন এবং ভারতের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতেও তাঁর সততা ও মানবিক ভাবমূর্তি তাঁকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
সুনীল দত্তের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর পুত্র Sanjay Dutt-এর প্রতি তাঁর অবিচল সমর্থন। ব্যক্তিগত সংকট ও আইনি জটিলতার সময় ছেলের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। আজও সঞ্জয় দত্ত তাঁর বাবাকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হিসেবে স্মরণ করেন। সম্প্রতি তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতেও আবেগঘন শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সঞ্জয় দত্ত। ২০০৩ সালে Munna Bhai M.B.B.S.-এ ছেলের সঙ্গে অভিনয় ছিল তাঁর শেষ চলচ্চিত্র উপস্থিতি। বাস্তব জীবনের বাবা-ছেলের সেই রসায়ন দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছিল। ছবিটি মুক্তির দুই বছর পরই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
সুনীল দত্ত ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি নায়কোচিত ব্যক্তিত্বকে শুধু পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও ধারণ করেছিলেন। তাঁর চলচ্চিত্র, সামাজিক কাজ ও মানবিক অবস্থান আজও ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।