
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলা চলচ্চিত্রের একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। নিজের আলাদা ভাবনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের বিশেষ ধারা দিয়ে তিনি বাংলা সিনেমাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। তাঁর ছবিতে সাধারণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন, দুঃখ-কষ্ট ও সমাজের নানা বাস্তবতা উঠে এসেছে খুব সহজ ও গভীরভাবে। আজ এই গুণী নির্মাতা ও কবির মৃত্যুদিন৷
১৯৪৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির পুরুলিয়ার আনাড়ায় তাঁর জন্ম। শৈশবের নানা অভিজ্ঞতা, গ্রামীণ প্রকৃতি এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীকালে কিছুদিন অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কাজ করলেও চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর আকর্ষণ তাঁকে সিনেমার জগতে নিয়ে আসে।
১৯৭৮ সালে তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দূরত্ব’ মুক্তি পায়। এরপর ‘নিম অন্নপূর্ণা’, ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘আঁধি গলি’, ‘বাঘ বাহাদুর’, ‘তাহাদের কথা’, ‘চরাচর’, ‘উত্তরা’, ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’, ‘কালপুরুষ’, ‘স্বপ্নের দিন’সহ একের পর এক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্র ধারায় নিজস্ব স্থান তৈরি করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্ন, প্রতীক ও কবিতার মিশ্রণ একটি স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্ব সৃষ্টি করেছিল।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সৃজনশীল জীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি আসে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে। তাঁর ‘বাঘ বাহাদুর’, ‘চরাচর’, ‘লাল দরজা’, ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’ ও ‘কালপুরুষ’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া ‘উত্তরা’ ও ‘স্বপ্নের দিন’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি দুবার শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর চলচ্চিত্র বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রশংসিত হয়।
চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ কবিও ছিলেন। তাঁর কবিতার ভাষা ও সংবেদনশীলতা চলচ্চিত্রের দৃশ্য নির্মাণেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সমালোচকদের মতে, তাঁর সিনেমা ছিল মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, বঞ্চনা এবং অস্তিত্বের অনুসন্ধানের এক চিত্রকাব্য।
২০২১ সালের ১০ জুন কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণ বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু ‘বাঘ বাহাদুর’-এর নিঃসঙ্গ শিল্পী, ‘চরাচর’-এর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কিংবা ‘উত্তরা’র রূপকধর্মী জগৎ আজও প্রমাণ করে—বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কেবল একজন পরিচালক নন, তিনি ছিলেন পর্দার এক কবি।
মৃত্যুদিনে এই মহান চলচ্চিত্রকারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর চলচ্চিত্র আগামী প্রজন্মের কাছে শিল্প, মানবতা ও কল্পনার এক অনন্ত পাঠ হয়ে থাকবে।