
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ কিংবদন্তি বাঙালি অভিনেতা ছবি বিশ্বাস-এর মৃত্যুদিন। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি রাজকীয় অভিনয়ের এক অবিস্মরণীয় নাম৷ তাঁর উপস্থিতি রুপালি পর্দাকে অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর গভীর কণ্ঠস্বর, সংযত সংলাপ উচ্চারণ, সহজাত অভিনয়, অভিজাত ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্রের অন্তর্গত অনুভূতিকে ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা অভিনেতাদের একজনের মর্যাদা দিয়েছে।
১৯০০ সালের ১৩ জুলাই ব্রিটিশ ভারতের কলকাতার আহিরীটোলায় তাঁর জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস। মা স্নেহ করে তাঁর নাম রাখেন “ছবি”, আর সেই নামেই তিনি বাংলা অভিনয় জগতের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন। তিনি হিন্দু স্কুলে পড়াশোনা শেষে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও বিদ্যাসাগর কলেজে অধ্যয়ন করেন। ছাত্রজীবনেই নাটকের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় এবং নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ী-এর অভিনয় তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু হলেও পরে তিনি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। ১৯৩৬ সালে অন্নপূর্ণার মন্দির চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর নর্তকী, দুই পুরুষ, বিরাজ বৌসহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয়ের অনন্য স্বাক্ষর রাখেন। বিশেষ করে বৃদ্ধ জমিদার, অভিজাত পরিবারের কর্তা কিংবা কর্তৃত্বপূর্ণ চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অতুলনীয়।
বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিচালক সত্যজিৎ রায়-এর জলসাঘর (১৯৫৮), দেবী (১৯৬০) এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২)। জলসাঘর-এ জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়া পরিচালক তপন সিংহ-এর কাবুলিওয়ালা চলচ্চিত্রেও তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
১৯৬০ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়। এটি তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি।
১৯৬২ সালের ১১ জুন এক সড়ক দুর্ঘটনায় এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্র হারায় অভিনয়ের এক মহীরুহকে। পরে সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর এমন মধ্যবয়সী চরিত্র তিনি আর লেখেননি, যার জন্য ছবি বিশ্বাসের মতো উচ্চমানের অভিনয় প্রতিভা প্রয়োজন হতো।
ছবি বিশ্বাস বাংলা অভিনয়শিল্পের এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। সময় বদলেছে, চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, কিন্তু তাঁর চোখের ভাষা, সংলাপের গাম্ভীর্য এবং চরিত্র নির্মাণের অসাধারণ ক্ষমতা আজও অভিনয়শিল্পীদের কাছে শিক্ষার বিষয় হয়ে আছে। কালের সীমানা পেরিয়ে আজও যেন জীবন্ত ছবি বিশ্বাসের অভিনয়।
তাঁর মৃত্যুদিনে বাংলা চলচ্চিত্রের এই মহীরুহের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।