
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ ৪ জুন—বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম, চলচ্চিত্রকার বাদল রহমানের জন্মদিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে দেশের চলচ্চিত্র জগতে বিশেষ করে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলন, ফিল্ম সোসাইটি কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক জাগরণে তাঁর ভূমিকা আজও গভীরভাবে স্মরণ করা হয়।
বাদল রহমান চলচ্চিত্র সম্পাদনার ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ভারতের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট থেকে। দেশে ফিরে তিনি চলচ্চিত্রচর্চা ও ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে তিনি সহ-নির্মাতা হিসেবে প্রথম চলচ্চিত্র প্রতীক্ষার সূর্য নির্মাণ করেন, যা তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয় ।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো শিশুদের জন্য পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে পথিকৃৎ ভূমিকা। ১৯৮০ সালে তিনি নির্মাণ করেন এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, যা দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। জার্মান লেখক এরিখ কেস্টনারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি একই সঙ্গে সমালোচক ও দর্শকমহলে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও একাধিক বিভাগে স্বীকৃতি পায়৷ এরপর তিনি শিশুদের জন্য আরও কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেমন কাঁঠালবুড়ির বাগান এবং ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ, যা বাংলাদেশ শিশু একাডেমির অর্থায়নে নির্মিত হয়।
বাদল রহমান শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও পরবর্তী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়। তিনি ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ-এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন এবং দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র সমাজ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শিশুদের জন্য আলাদা দর্শন ও নান্দনিকতা তৈরি করে। তিনি বিশ্বাস করতেন—শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, বরং শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁর এই দর্শন পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
২০১০ সালের ১১ জুন তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর কাজ ও চিন্তা আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গভীরভাবে উপস্থিত। তিনি একটি চলচ্চিত্র আন্দোলনের ইতিহাসকে স্মরণ করা। তাঁর জীবন ও কাজ বাংলাদেশের শিশুতোষ চলচ্চিত্রের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, যা এখনও বিকাশমান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনি শুধুমাত্র একজন নির্মাতা নন, একটি পথপ্রদর্শক অধ্যায়।
জন্মদিনে এই মহান চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।