
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে কবিতাকে সুরের ভেতর দিয়ে নতুনভাবে উপস্থাপনের যে ধারা গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম প্রধান কারিগর শাহীন সরদার। ‘কবিতার গান’-খ্যাত এই সংগীতপরিচালক, সুরকার এবং বেতার–টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী দীর্ঘ সময় ধরে কবিতার কাব্যিক সৌন্দর্যকে সুরের মাধ্যমে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে আসছেন। আজ তাঁর জন্মদিনে সংগীতাঙ্গনে তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছার আবহ। তার সুরে কবিতা শুধু পাঠ নয়, হয়ে উঠেছে এক ধরনের সংগীতময় অনুভূতি, যেখানে শব্দের ভেতর সুর এবং সুরের ভেতর কবিতা মিলেমিশে এক অনন্য শিল্পভাষা তৈরি করেছে।
শাহীন সরদারের জন্ম ১৯৬২ সালের ৩০ মে মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার শ্রীধরপুর গ্রামে। শৈশবের কিছু সময় গ্রামে কাটিয়ে ১৯৬৫ সাল থেকে তিনি ঢাকার নারিন্দায় এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সাল থেকে স্থায়ীভাবে মোহাম্মদপুরে বসবাস শুরু করেন। সংগীতের প্রতি তার আগ্রহ জন্ম নেয় পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে, বিশেষ করে তার বড় ভাই সরদার আলাউদ্দিনের প্রভাব তার জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান শুনে তার মধ্যে দেশাত্মবোধ ও সংগীতচর্চার আগ্রহ আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু ১৯৭২ সালে বড় ভাইয়ের অকাল মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে গভীরভাবে নাড়া দিলেও সেই স্মৃতি ও দেশপ্রেমই তাকে সংগীতের পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৭৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীতের দীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তিনি উচ্চাঙ্গসংগীত ও নজরুলসংগীতের প্রশিক্ষণ নেন ওস্তাদ আমানুল্লাহ খান, অবনী মোহন দে, বদরুল আলম এবং মো. রফিকুল ইসলামের কাছে। পরবর্তীতে লোকসংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে তিনি ১৯৮২ সালে ছায়ানটে ভর্তি হন। সেখানে সন্জীদা খাতুন এবং ওস্তাদ মোমতাজ আলী খানের তত্ত্বাবধানে তার সংগীতচর্চা আরও পরিণত হয়। বিশেষ মেধার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে সরাসরি চতুর্থ বর্ষে ভর্তি নেওয়া হয়, যা তার সংগীত প্রতিভার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিল্পী হিসেবে শাহীন সরদারের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৮৫ সালে, যখন তার কণ্ঠ ও সুরে ১৪টি গানের একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশিত হয় কনকর্ড এন্টারপ্রাইজ থেকে। এই অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেন পান্না দাস। যদিও তিনি বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন, তবুও বাণিজ্যিক ধারার গানের বাইরে সৃজনশীল ও সাহিত্যনির্ভর সংগীতের প্রতি তার আগ্রহ ধীরে ধীরে তাকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।
আশির দশকের শেষ দিকে তিনি উপলব্ধি করেন, কবিতার গভীরতা এবং সংগীতের সুর একত্রিত হলে নতুন এক শিল্পভাষা তৈরি করা সম্ভব। এই ভাবনা থেকেই তিনি কবিতাকে সুরে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন। উপমহাদেশের সলিল চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ এবং শেখ লুৎফর রহমানের কবিতা-নির্ভর সংগীত তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিখ্যাত গীতিকবিদের কাছে সরাসরি পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় তিনি কবিদের কবিতা বেছে নিয়ে সেগুলোতে সুরারোপের পথ গ্রহণ করেন।
২০০৫ সালের জানুয়ারিতে তার ‘কবিতার গান’ আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ডিং শুরু হয়। এই সময় তিনি জীবনানন্দ দাশের “আবার আসিব ফিরে” এবং জসীমউদ্দীনের “নিমন্ত্রণ” কবিতায় সুরারোপ করেন। গানগুলো যথাক্রমে সুবীর নন্দী ও সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। এই প্রকল্পের প্রযোজনা করেন একুশে টেলিভিশনের কাওসার মাহমুদ। এই কাজই পরবর্তীতে তাকে কবিতার গানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
২০০৭ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার সুর ও সংগীত পরিচালনায় ‘কবিতার গানে স্বদেশ’ নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। এতে সৈয়দ আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, শাম্মী আখতার, ফেরদৌস আরা এবং সামিনা চৌধুরীর মতো প্রখ্যাত শিল্পীরা তার সুরে কবিতার গান পরিবেশন করেন। এটি কবিতানির্ভর সংগীতচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
তার সংগীতজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘কবিতার গান’ শীর্ষক অ্যালবাম। এটি তার কন্যা ঐশিকা নদীর কণ্ঠে প্রকাশিত হয় এবং এতে জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরীসহ একাধিক কবির কবিতা স্থান পায়। এই অ্যালবামটি বাংলাদেশের কবিতার গানে পূর্ণাঙ্গ একক অ্যালবামের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
শাহীন সরদার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ও দেশাত্মবোধক গানেও উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। নির্মলেন্দু গুণের “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো” কবিতাসহ বিভিন্ন কবিতাকে তিনি গানে রূপ দিয়েছেন। শামসুর রাহমানের “স্বাধীনতা তুমি” কবিতাও তার সুরে সংগীতে রূপ নেয়। পাশাপাশি তিনি সুমন সরদারের “শিশিরধোয়া মাঠ পেরিয়ে”সহ বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গানের সুরকার হিসেবে পরিচিত।
তার সৃষ্ট কবিতার গান শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। সম্প্রতি জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতা থেকে সুরারোপিত গান ভারতের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী শুভমিতা ব্যানার্জীর কণ্ঠে প্রকাশিত হয়, যা তার কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে শাহীন সরদার বাংলাদেশ বেতারে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে স্বীকৃতি পান (২০১৯)। এছাড়া রোদশী সম্মাননা, ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী সম্মাননা, স্বপ্নকুঁড়ি সম্মাননা এবং উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সম্মাননাসহ একাধিক পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন। বিটিভির ৫০ বছর পূর্তির থিম সং তার সুরে নির্বাচিত হওয়াও তার সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
বর্তমানে তিনি সংগীতচর্চা ও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও অনুপ্রেরণা দেওয়ার কাজ অব্যাহত রেখেছেন। তরুণ সুরকারদের উদ্দেশে তার পরামর্শ হলো—লোকজ সুরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে মৌলিক গান তৈরি করতে হবে এবং প্রতিটি সৃষ্টিকে মনেপ্রাণে অনুভব করে উপস্থাপন করতে হবে।
আজ জন্মদিনে এই কবিতার গানের কারিগর শাহীন সরদারকে ঘিরে সংগীতাঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং তাঁর সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতার অনুভূতি। কবিতা ও সুরের এই মেলবন্ধন তাঁকে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।