
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ ১ জুন। বাংলাদেশের অভিনয় জগতের অন্যতম শক্তিমান শিল্পী চঞ্চল চৌধুরী–এর জন্মদিন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং ওটিটি মাধ্যমে অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সম্মানিত অভিনেতা হিসেবে।
১৯৭৫ সালের ১ জুন পাবনা জেলার সুজানগরের বোয়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া চঞ্চল চৌধুরীর প্রকৃত নাম সুচিন্ত চৌধুরী চঞ্চল। শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকেই শিল্পচর্চার ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়।
অভিনয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৬ সালে নাট্যদল আরণ্যক নাট্যদল-এর মাধ্যমে। মঞ্চে ‘চে’র সাইকেল’, ‘সংক্রান্তি’সহ একাধিক নাটকে অভিনয় করে তিনি দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়েন। বিশেষ করে ‘চে’র সাইকেল’ নাটকে তাঁর বহুমাত্রিক অভিনয় আজও নাট্যাঙ্গনে আলোচিত।
টেলিভিশনে তাঁর উত্থান ঘটে ২০০০-এর দশকে। ‘সূর্যের হাসি’, ‘ভবের হাট’, ‘সাকিন সারিসুরি’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত মুখে পরিণত হন। গ্রামীণ চরিত্র, কৌতুকধর্মী চরিত্র কিংবা গভীর মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অভিনয় ছিল স্বতন্ত্র ও বিশ্বাসযোগ্য।
চলচ্চিত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ‘মনপুরা’র মাধ্যমে। গিয়াস উদ্দিন সেলিম পরিচালিত এই চলচ্চিত্র শুধু বাণিজ্যিকভাবেই নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও এক যুগান্তকারী ঘটনা হয়ে ওঠে। এরপর ‘মনের মানুষ’, ‘আয়নাবাজি’, ‘দেবী’ এবং ‘হাওয়া’র মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের অভিনয়শক্তির নতুন নতুন মাত্রা উন্মোচন করেন। বিশেষ করে ‘আয়নাবাজি’র আয়না চরিত্র কিংবা ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রের চান মাঝি চরিত্র তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুনভাবে পরিচিত করে। চরিত্রের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে যাওয়ার বিরল ক্ষমতার জন্য তাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ‘মেথড অ্যাক্টর’ বলেও অভিহিত করেন অনেক চলচ্চিত্র বিশ্লেষক।
ওটিটি যুগেও তিনি সমান সফল। ‘তকদীর’, ‘কারাগার’ এবং অন্যান্য ওয়েব কনটেন্টে তাঁর অভিনয় নতুন প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
কর্মজীবনে তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার অর্জন করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতামূলক নানা কর্মকাণ্ডেও তাঁকে সক্রিয় দেখা যায়।
এক সাক্ষাৎকারে জন্মদিন প্রসঙ্গে চঞ্চল চৌধুরী বলেছিলেন, জন্মদিন তাঁর কাছে আনন্দের পাশাপাশি কিছুটা বিষণ্নতারও উপলক্ষ, কারণ প্রতিটি জন্মদিন তাঁকে জীবনের আরেকটি বছর পেরিয়ে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।
আজ জন্মদিনে বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের এই গুণী অভিনেতার প্রতি রইল গভীর শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। অভিনয়ের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, চরিত্রের প্রতি তাঁর আত্মনিবেদন এবং শিল্পবোধ আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বহুদিন।
উল্লেখযোগ্য কাজ: মনপুরা, আয়নাবাজি, দেবী, হাওয়া, মনের মানুষ, তকদীর, কারাগার, ভবের হাট, সাকিন সারিসুরি, সূর্যের হাসি প্রভৃতি।