
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ ১ জুন। হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী Marilyn Monroe-এর জন্মদিন। ১৯২৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের Los Angeles-এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মনাম ছিল নরমা জিন মর্টেনসন (Norma Jeane Mortenson)। কিন্তু পৃথিবী তাঁকে চেনে এক অন্য নামে—মেরিলিন মনরো।
হলিউডের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের জীবন ও শিল্প একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক ধরনের কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। মেরিলিন মনরো তাঁদের অন্যতম। মৃত্যুর ছয় দশকেরও বেশি সময় পরেও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় বিস্ময়, কৌতূহল এবং মুগ্ধতার সঙ্গে। আজ তাঁর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বের নানা প্রান্তে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে নতুনভাবে।
শৈশব থেকেই তাঁর জীবন ছিল অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় ভরা। মায়ের মানসিক অসুস্থতার কারণে ছোটবেলার বড় অংশ তাঁকে কাটাতে হয়েছিল পালক পরিবার ও এতিমখানায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন James Dougherty-কে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি কারখানায় কাজ করার সময় একজন আলোকচিত্রীর নজরে আসেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় মডেলিং জগতে তাঁর উত্থান, যা পরে তাঁকে নিয়ে যায় চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়ায়।
১৯৫০-এর দশকে তিনি দ্রুত হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের একজন হয়ে ওঠেন। প্রথমদিকে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে তাঁর অভিনয় দক্ষতা ও পর্দা-উপস্থিতি দর্শকদের মন জয় করে নেয়। The Asphalt Jungle এবং All About Eve-এ অভিনয়ের পর তাঁর ক্যারিয়ার নতুন গতি পায়।
১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত Niagara, Gentlemen Prefer Blondes এবং How to Marry a Millionaire তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে “Diamonds Are a Girl’s Best Friend” গানে তাঁর উপস্থিতি পরবর্তীকালে জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় প্রতীকে পরিণত হয়।
যদিও তাঁকে দীর্ঘদিন শুধু ‘ব্লন্ড বম্বশেল’ বা গ্ল্যামার আইকন হিসেবেই দেখা হয়েছে, চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে তাঁর অভিনয় প্রতিভা অনেক সময় অবমূল্যায়িত হয়েছে। Bus Stop, Some Like It Hot এবং The Misfits-এ তিনি তাঁর অভিনয়ের গভীরতা ও বহুমাত্রিকতা প্রমাণ করেছিলেন। বিশেষ করে “Some Like It Hot”-এ অভিনয়ের জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার লাভ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন সংবাদমাধ্যমের অন্যতম আকর্ষণ। কিংবদন্তি বেসবল তারকা Joe DiMaggio এবং নাট্যকার Arthur Miller-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা এবং ওষুধনির্ভরতা তাঁর জীবনকে ক্রমশ জটিল করে তোলে।
১৯৬২ সালের ৪ আগস্ট রাতে তাঁর জীবনের করুণ সমাপ্তি ঘটে। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসের নিজ বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সরকারি তদন্তে তাঁর মৃত্যু বারবিচুরেট ওষুধের অতিরিক্ত সেবনের ফলে সংঘটিত ‘সম্ভাব্য আত্মহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁর মৃত্যু ঘিরে নানা বিতর্ক ও রহস্য আজও মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে আছে।
মেরিলিন মনরোকে নিয়ে গবেষণা, প্রদর্শনী, বই ও চলচ্চিত্র নির্মাণ এখনও অব্যাহত রয়েছে। তাঁর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে Academy Museum of Motion Pictures-এ বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে তাঁর ব্যবহৃত পোশাক, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র ও চলচ্চিত্র-স্মারক প্রদর্শিত হচ্ছে।
আজ মেরিলিন মনরো শুধু একজন অভিনেত্রী হিসেবে নন, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও স্মরণীয়। সৌন্দর্য, খ্যাতি, নিঃসঙ্গতা, সাফল্য ও ট্র্যাজেডির এক জটিল মিশ্রণ হিসেবে তিনি এখনও বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের কল্পনা ও স্মৃতিতে বেঁচে আছেন। শতবর্ষ পরেও তাঁর হাসি, তাঁর উপস্থিতি এবং তাঁর রহস্যময় ব্যক্তিত্ব যেন হলিউডের ইতিহাসে এক অনন্ত আলোকরেখা হয়ে জ্বলছে।
জন্মশতবর্ষে রুপালি পর্দার এই অমর কিংবদন্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।