
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: ৩১ মে। ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব অনিল বিশ্বাস-এর মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৩ সালের এই দিনে নয়াদিল্লিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। কিন্তু তাঁর সৃষ্ট সুর, সংগীতচিন্তা এবং চলচ্চিত্র সংগীতে আনা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আজও ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
১৯১৪ সালের ৭ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বরিশাল জেলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন অনিল কৃষ্ণ বিশ্বাস। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আকর্ষণ। কৈশোরে তিনি তবলা বাজানো, গান গাওয়া এবং সুরারোপে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। একই সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি, যার কারণে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছিল তাঁকে।
ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের বিকাশে অনিল বিশ্বাসের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ সংগীত পরিচালক হিসেবে গণ্য করা হয়। প্লেব্যাক সিঙ্গিংয়ের প্রাথমিক যুগে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন এবং ভারতীয় সিনেমায় বৃহৎ অর্কেস্ট্রার ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলেন। চলচ্চিত্র সংগীতে পাশ্চাত্য সিম্ফনিক ধারা ও ভারতীয় শাস্ত্রীয়, বাউল এবং ভাটিয়ালি সংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি এক স্বতন্ত্র সংগীতভাষা নির্মাণ করেছিলেন।
তাঁর সুরারোপিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে Roti, Kismet, Anokha Pyar, Tarana, Waaris, Pardesi এবং Char Dil Char Rahen। তাঁর সুরে সৃষ্টি হয়েছে বহু কালজয়ী গান, যা আজও সংগীতপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান।
সংগীত পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি ‘কাউন্টার মেলোডি’ ব্যবহারের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে কোরাল অ্যারেঞ্জমেন্ট, অর্কেস্ট্রেশন এবং রাগভিত্তিক আধুনিক সুরায়োজনের যে ধারা পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তা পায়, তার অন্যতম ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন অনিল বিশ্বাস। তাঁর প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য সংগীত পরিচালকের কাজে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৬ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান Sangeet Natak Akademi প্রদত্ত সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।
মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি সময় পরে আজও অনিল বিশ্বাসকে স্মরণ করা হয় ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের এক মহান স্থপতি হিসেবে। তাঁর সৃষ্ট সুরের ঐশ্বর্য, নন্দনচেতনা ও উদ্ভাবনী সংগীতভাবনা ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
মৃত্যুদিবসে এই মহান সুরসাধকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।