
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: ভারতীয় চলচ্চিত্র ও মঞ্চনাট্যের ইতিহাসে যে ক’জন মানুষ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন, তাঁদের অন্যতম পৃথ্বীরাজ কাপুর। আজ তাঁর মৃত্যুদিন। ১৯৭২ সালের ২৯ মে তিনি মুম্বাইয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শিল্পভুবন, অভিনয়ের ঐতিহ্য ও থিয়েটারচর্চা আজও ভারতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
১৯০৬ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের সামুন্দ্রিতে জন্মগ্রহণ করেন পৃথ্বীরাজ কাপুর। অভিনয়ের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থেকেই তিনি পেশোয়ার ও লায়ালপুরের মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন। পরে মুম্বাইয়ে এসে নির্বাক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়। ভারতের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘আলম আরা’-তেও তিনি অভিনয় করেন, যা তাঁকে ভারতীয় সিনেমার প্রারম্ভিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীতে পরিণত করে।
চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠস্বর, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের গভীরতা তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। সোহরাব মোদীর ‘সিকান্দার’ চলচ্চিত্রে আলেকজান্ডারের চরিত্র এবং কে. আসিফের ‘মুঘল-ই-আজম’-এ সম্রাট আকবরের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় আজও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। একই সঙ্গে ‘সীতা’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘আওয়ারা’সহ বহু চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
তবে শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, পৃথ্বীরাজ কাপুরের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল মঞ্চনাট্যে। ১৯৪৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘পৃথ্বী থিয়েটার’, যা ভারতীয় হিন্দি থিয়েটারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ভ্রাম্যমাণ থিয়েটারদল ভারতের নানা প্রান্তে নাটক মঞ্চস্থ করে নাট্যচর্চাকে নতুন প্রাণ দিয়েছিল। পরবর্তীতে এই থিয়েটার থেকেই বহু শিল্পী, পরিচালক ও সংগীতকার উঠে আসেন।
পৃথ্বীরাজ কাপুর শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক বিশাল শিল্পপরিবারের ভিত্তি। তাঁর সন্তান রাজকাপুর, শাম্মী কাপুর এবং শশী কাপুর পরবর্তীকালে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেন। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও বলিউডে সমানভাবে সক্রিয় থেকে কাপুর পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পৃথ্বীরাজ কাপুর ১৯৬৯ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হন। মৃত্যুর পর তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রদান করা হয়।
আজ তাঁর মৃত্যুদিনে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগত গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে তাঁকে, তিনি শুধু অভিনয় করেননি—একটি শিল্পঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছিলেন।