
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: ভারতীয় চলচ্চিত্রের নান্দনিক ও সমান্তরাল ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন ৩০ মে। ১৯৪৫ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় তাঁর জন্ম। অভিনয়জগতে তিনি বাণিজ্যিকতার বাইরে গিয়ে শিল্পনির্ভর চলচ্চিত্রের ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয় ১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রেই তাঁর সংযত, অন্তর্মুখী ও বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয়শৈলী দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়ে। এরপর তিনি ধীরে ধীরে ভারতীয় “সমান্তরাল সিনেমা” আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন, যেখানে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও অপর্ণা সেনের মতো নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করেন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য বাংলা চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আকালের সন্ধানে’, ‘গণশত্রু’, ‘আগন্তুক’, ‘চতুরঙ্গ’, ‘নৌকাডুবি’, এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রজন্মের চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি তাঁকে একইসঙ্গে ক্লাসিক ও সমকালীন করে তুলেছে। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি এনে দেয়, যেখানে তাঁর অভিনয়কে “সংযমের মধ্যে গভীরতা” হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় হিন্দি, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার চলচ্চিত্রেও সমানভাবে কাজ করেছেন। ‘কাহানি’, ‘পিঙ্ক’, ‘গুরু’, ‘ফিফটিন পার্ক অ্যাভিনিউ’, ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’—এমন বহু চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তিনি কেবল আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক মানের একজন অভিনেতা।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বিজ্ঞাপন, তথ্যচিত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি কখনও মূলধারার তারকা সংস্কৃতির অংশ না হয়ে নিজস্ব এক নির্জন, বুদ্ধিবৃত্তিক অভিনয়ভাষা তৈরি করেছেন। এই কারণে তাঁকে ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্রের এক “নীরব স্থপতি” হিসেবে গণ্য করা হয়।
সমালোচকদের মতে, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সংযম। ক্যামেরার সামনে অতিরিক্ত অভিব্যক্তির পরিবর্তে তিনি চরিত্রের ভেতরের চিন্তা ও দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলেন, যা তাঁর অভিনয়কে গভীর ও বাস্তবধর্মী করে তোলে।
ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় ভারতীয় সমান্তরাল সিনেমার এক জীবন্ত ইতিহাস। তিনি তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ভাষাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
জন্মদিনে এই সৃজনশীল ও শক্তিমান অভিনেতার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা৷