
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের মুখ হয়তো পর্দায় খুব বেশি দেখা যায়নি, কিন্তু তাঁদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় চলচ্চিত্র। উদয়ন চৌধুরী ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। পরিচালক, কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার, সাংবাদিক— প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও নিবেদিতপ্রাণ। আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে এই বরেণ্য চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বকে।
উদয়ন চৌধুরীর প্রকৃত নাম ছিল ইসমাইল মোহাম্মদ। ১৯১৮ সালের ২৮ মে ঢাকার ওয়ারিতে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, নাটক আর অভিনয়ের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। স্কুলজীবনেই লেখালেখি ও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। পরে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে কলকাতায় যান। সেখানে চাকরির পাশাপাশি ইসলামিয়া কলেজ থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। সেই সময় কলকাতার সাহিত্য ও নাট্যচর্চার পরিবেশ তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
চলচ্চিত্রে তাঁর পথচলা শুরু হয় চল্লিশের দশকে। গুণময় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘মাতৃহারা’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রবেশ করেন। এরপর ১৯৪৪ সালে প্রথম বাঙালি মুসলমান হিসেবে কলকাতায় বাণিজ্যিকভাবে ‘জোয়ার’ নাটক মঞ্চস্থ করে আলোচনায় আসেন।
১৯৪৬ সালে কলকাতায় মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘মানুষের ভগবান’। সামাজিক কুসংস্কার, শোষণ ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বক্তব্য নিয়ে নির্মিত হয়েছিল ছবিটি। সে সময় ছবিটি বেশ আলোড়ন তোলে এবং এর কারণে সরকারি রোষানলেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁর সৃজনশীল পথচলাকে থামাতে পারেনি।
দেশভাগের পর ঢাকায় ফিরে এসে তিনি নতুনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণে মন দেন। পরিচালনা করেছেন ‘চোরাবালি’, ‘নায়িকা’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্র। তবে পরিচালক হিসেবে যতটা পরিচিতি পেয়েছেন, তার চেয়েও বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে।
বাংলাদেশের বহু জনপ্রিয় ও দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রে তাঁর লেখা গল্প ও সংলাপ ব্যবহার হয়েছে। ‘এতটুকু আশা’, ‘দীপ নিভে নাই’, ‘পুত্রবধূ’, ‘ভাঙ্গাগড়া’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘মেঘের অনেক রঙ’, ‘মা ও ছেলে’, ‘অনুরাগ’, ‘কাজল রেখা’, ‘সবার উপরে মা’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্র তাঁর সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর লেখায় ছিল সহজ-সরল অথচ আবেগময় মানবিকতা। পারিবারিক সম্পর্ক, সমাজবাস্তবতা আর মানুষের সুখ-দুঃখকে তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে তুলে আনতে পারতেন।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যেও ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জাতীয় কবি Kazi Nazrul Islam সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকায় কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া ‘সত্যযুগ’, ‘কাফেলা’ এবং সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর লেখা কয়েকটি বইও প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘জোয়ার এলো’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস’ এবং ‘নাট্যকলার ক্রমবিকাশ’।
শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর নিবেদন ছিল আজীবনের। তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, অভিনেতা, সংগঠক এবং মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।
২০০৪ সালের ৮ মার্চ তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর লেখা সংলাপ, তাঁর ভাবনা আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জীবন্ত হয়ে আছে।
জন্মদিনে এই গুণী চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উদয়ন চৌধুরী একটি অনিবার্য নাম হয়ে থাকবে।