
শিশুতোষ রূপকথার গল্প
সূর্যমুখীর দেশ—রোদ্দুর আর রঙিনের গল্প
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
কোথাও একসময়, খুব দূরের নয়, আর একেবারে চোখের সামনেও নয়—একটা ছোট্ট গ্রাম ছিল। গ্রামের নাম ধুপগাছিয়া। এই গ্রামের সকালটা সবসময় অন্য গ্রামের সকাল থেকে একটু বেশি উজ্জ্বল, আর রাতটা একটু বেশি নরম। যেন আকাশ নিজেই গ্রামের উপরে একটা তুলতুলে চাদর মেলে রাখত।
এই গ্রামে থাকত রোদ্দুর। বয়স দশের মতো। পাতলা, চঞ্চল, আর এমন হাসি যে দেখলে মনে হতো, সূর্যটা একটু লজ্জা পেয়েছে। রোদ্দুরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল একটি অদ্ভুত ছোট্ট পাখি—রঙিন।
রঙিন অন্যসব পাখির মতো নয়। ওর পাখা রঙ বদলাতে পারে। কখনো সবুজ, কখনো কমলা, কখনো রক্তিম, কখনো আবার নীল—যেন আকাশের মনের মতোই বদলায়। গ্রামের লোকেরা বলে, “রঙিন হলো জাদুর বার্তা নিয়ে আসা পাখি।”
কিন্তু রোদ্দুর এসব কিছুই ভাবে না; সে ভাবে—
“রঙিন আমার বন্ধু, আর বন্ধুর কোনো বিশেষ ব্যাখ্যা লাগে না।”
সেদিন ভোরবেলা রোদ্দুর ছুটে এল তার ছোট্ট উঠানে। গাছের ডালে বসে রঙিন ডাকছিল—
— “চিঁ চিঁ! তাড়াতাড়ি এসো! আজ অন্যরকম কিছু দেখাব!”
রোদ্দুর বুঝতে পারে রঙিন কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে। সে পাখিটাকে বলল—
— “আচ্ছা, কোথায় যাবে? দেরি হলে মা রাগ করবে।”
রঙিন আবার ডাকল,
— “চলো, আমি তোমাকে এমন এক জায়গা দেখাব যেখানে কেউ কোনোদিন যায়নি!”
রোদ্দুর একটু ভয় পেলেও কৌতূহল তার ভয়কে গিলে ফেলল। সে ব্যাগ থেকে বিস্কুট, লুচি, আর একটা ছেঁড়া মানচিত্র নিয়ে ছুটল রঙিনের পেছনে।
মানচিত্রটা ছিল তার দাদুর দেওয়া। দাদু বলেছিলেন—
“এই মানচিত্রে এমন কিছু আছে, যা শুধু সাহসী আর সৎ মানুষই খুঁজে পায়।”
রোদ্দুর কখনো বুঝতে পারেনি দাদু কী বলেছিলেন, কিন্তু আজ মনে হলো মানচিত্রটা বোধহয় কাজ দেবে।
রঙিন উড়তে উড়তে রোদ্দুরকে নিয়ে গেল গ্রামের শেষ মাথায়। সেখানে একটা পুরনো বটগাছ, যার গোড়ায় সবসময় কুয়াশা লেগে থাকে। রঙিন নিচে নেমে বলল—
— “দেখো, এখানেই পথ!”
রোদ্দুর তাকিয়ে দেখে, গাছের শেকড়ের ফাঁক দিয়ে বাতাস টান টান, মনে হয় ভেতরে কোথাও একটা ছোট দরজা লুকিয়ে আছে।
অনেকটা সাহস জোগাড় করে সে হাত বাড়াতেই—
হঠাৎ ঝুপ করে একটা আলো!
বটগাছের শেকড় একটু সরে গেল, আর ভেতরে দেখা গেল সরু একটা পথ।
রঙিন বলল,
— “এটাই জাদুকরের পথ। ভয় পেয়ো না, আমি আছি।”
রোদ্দুর প্রথমে একটু কেঁপে গেল। কিন্তু বন্ধুর দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—
“বন্ধু পাশে থাকলে কোনো পথই অন্ধকার থাকে না।”
ওরা ভেতরে ঢুকতেই আশপাশের বাতাস পাল্টে গেল। গাছপালার রঙ হয়ে গেল হালকা নীল। পথের দুই পাশে ফুলগুলো ছোট্ট বাতির মতো জ্বলছিল।
রোদ্দুর অবাক হয়ে বলল—
— “এই পথ কোথায় যায়?”
রঙিন হেসে বলল,
— “সূর্যমুখীর দেশে।”
কিছু দূর এগোতেই তারা পৌঁছাল ছোট্ট এক বাঁশের সেতুর কাছে। নিচে কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে একটা সোনালি রঙের স্রোত। রোদ্দুর বিস্ময়ে বলল—
— “এই পানি এমন কেন?”
রঙিন বলল,
— “এটা স্বপ্নের নদী। যারা খুব সুন্দর কিছু ভাবতে পারে, তাদের স্বপ্ন থেকে এই নদী জন্মায়।”
রোদ্দুর বলল,
— “তাহলে সবাই যদি সুন্দর কিছু ভাবে, নদী কি আরও বড় হবে?”
রঙিন মাথা নেড়ে বলল—
— “হ্যাঁ, আর পৃথিবিও তখন ভালো হবে।”
ওরা সেতু পেরিয়ে আরও ভেতরে ঢুকল।
অল্প একটু গিয়েই সামনে দেখা গেল রঙিন আলো ছড়ানো একটা খোলা জায়গা। জায়গাটা যেন রঙের উৎসব। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মিষ্টি সুবাস। আর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল সূর্যমুখী।
না, একে বিশাল বলা ভুল হবে।
এটা এত বড় যে মনে হয় সূর্যেরই একটা অংশ এখানে রেখে গেছে কেউ।
সূর্যমুখীর চারপাশে ছিল আরো হাজার হাজার ছোট সূর্যমুখী, যতদূর চোখ যায়। রোদ্দুর প্রথমবার এমন কিছু দেখল।
কিন্তু যতটা সুন্দর, ততটাই অদ্ভুত। জায়গাটায় কেউ নেই। পাখি নেই, পোকামাকড় নেই, এমনকি বাতাসও নেই।
রোদ্দুর বলল,
— “এত সুন্দর জায়গায় কেউ থাকে না?”
রঙিন একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল—
— “থাকত। অনেক আগে। এখন আর কেউ নেই।”
রোদ্দুর বুঝতে পারল, রঙিনের কণ্ঠে কেমন যেন কষ্ট।
সে জিজ্ঞেস করল,
— “কেন?”
রঙিন উত্তর দিল না। হঠাৎ একটা ঝড়ো আওয়াজ হলো। আকাশ যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। বড় সূর্যমুখীটা হেলে পড়ল গোল্লায়!
রোদ্দুর ভয় পেয়ে রঙিনকে জড়িয়ে ধরল।
মুহূর্তের মধ্যে নিচের মাটি দুই ভাগ হয়ে গেল…
আর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বিশাল কালো ছায়া—একটা মাথা-ওয়ালা লম্বাটে দানব।
তার চোখ দুটো জ্বলছে ধোঁয়ার মতো লাল আগুনে।
দানবের কণ্ঠ—
“কে? কে ঢুকেছে আমার নিষিদ্ধ বনে?”
রোদ্দুর কাঁপা গলায় বলল,
— “আমি… আমি শুধু এসেছি… দেখতে…”
দানব হেসে উঠল,
— “এটা দেখার জায়গা নয়। এটা আমার জায়গা! যেদিকে তাকাও, সব আমার!”
রঙিন সামনে উড়ে এসে বলল—
— “ওকে কিছু করবে না! ও শিশু, ও ভুল করে এসেছে।”
দানব আরও প্রচণ্ড রাগে বলল—
“সবাই ভুল করে আসে। তারপর নিজের স্বপ্নের আলো ফেলে রেখে যায়। আমি সেই আলো খাই!”
রোদ্দুর বুঝতে পারল, এই দানবের কারণে সূর্যমুখীর দেশ নষ্ট হয়ে গেছে।
তখনই রোদ্দুরের মনে পড়ল—
দাদুর মানচিত্র!
সে তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে মানচিত্র বের করল। মানচিত্রটা হাওয়ায় উড়ে গিয়ে দানবের দিকে গেল।
আর আশ্চর্যের বিষয়—
মানচিত্রটা দানবের গায়ে পড়তেই অদ্ভুত সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ল। দানব চিৎকার করে পেছনে সরে গেল।
রঙিন চেঁচিয়ে বলল,
— “হ্যাঁ! দাদুর মানচিত্র জাদুর মানচিত্র! এতে সূর্যের আশীর্বাদ আছে!”
রোদ্দুর মানচিত্রটা দুই হাতে তুলে ধরল।
আর সাথে সাথে মানচিত্র থেকে একসাথে হাজারটা আলো বের হয়ে দানবকে আঘাত করল।
দানব চিৎকার করতে করতে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল।
সূর্যমুখী ফুলগুলো আবার ওঠে দাঁড়াল।
চারপাশে বাতাস বইতে লাগল।
ঝিঁঝিঁ ডাক, পাখির গান আবার ফিরে এল।
রঙিন আনন্দে উড়ে এসে রোদ্দুরের কাঁধে বসল।
— “তুমি বাঁচালে আমাদের দেশ!”
রোদ্দুর বলল,
— “আমি কিছুই করিনি। মানচিত্রটাই করেছে।”
রঙিন নরম গলায় বলল—
— “মানচিত্র একা কিছু করতে পারে না। যার হৃদয়ে আলো থাকে, সেই পারে।”
হঠাৎ চারপাশে সূর্যমুখী ফুলগুলো একসাথে ঘুরে দাঁড়াল।
তারা যেন গান গাইছে—
রোদ্দুরের বুকে হালকা আলো ছড়িয়ে পড়ল।
রঙিন বলল—
— “এখন তুমি এক কামনা করতে পারো।”
রোদ্দুর ভাবল—
“আমি যদি চাই, এই জায়গাটা শুধু আমার আর রঙিনের জন্য থাকতে পারে।
কিন্তু তাহলে তো দানব যেমন ভাবত—সবকিছু নিজের করে নেয়!” সে