
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সারাহ বেগম কবরী—যিনি কেবল একজন অভিনেত্রী নন, বরং একটি সময়ের আবেগ, সংস্কৃতি ও প্রেমের প্রতীক। প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী এসে আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক সোনালি অধ্যায়ের অবসানের কথা।
জীবনের শুরু ও চলচ্চিত্রে উত্থান:
১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কবরী (জন্মনাম মীনা পাল)। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন এবং ১৯৬৪ সালে কিংবদন্তি নির্মাতা সুভাষ দত্তের সুতরাং ছবির মাধ্যমে অভিনয় জীবন শুরু করেন।
মাত্র কিশোরী বয়সেই তার অভিনয় দক্ষতা দর্শক ও নির্মাতাদের নজর কাড়ে। এরপর দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা।
সাফল্যের স্বর্ণযুগ:
ষাট ও সত্তরের দশকে কবরী ছিলেন রোমান্টিক ও সামাজিক চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান মুখ। নায়করাজ রাজ্জাক–এর সঙ্গে তাঁর জুটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—সাত ভাই চম্পা, নীল আকাশের নিচে, তিতাস একটি নদীর নাম, সুজন সখী, সারেং বৌ, বধূ বিদায় প্রভৃতি৷
বিশেষ করে সারেং বৌ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
কবরী তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনে—
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী)
আজীবন সম্মাননা (২০১৩)
একাধিক বাচসাস পুরস্কার
অর্জন করেন, যা তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্থায়ী আসনে বসিয়েছে।
রাজনীতি ও সামাজিক ভূমিকা:
শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, কবরী সমাজ ও রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং নারী অধিকার ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে কাজ করেন।
মৃত্যু: এক অধ্যায়ের সমাপ্তি:
২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন কবরী। তার মৃত্যু শুধু একজন অভিনেত্রীর বিদায় নয়—বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক স্বর্ণযুগের অবসান হিসেবে বিবেচিত হয়।
উত্তরাধিকার ও স্মরণ:
কবরী ছিলেন “সিনেমার মিষ্টি মেয়ে”—যার হাসি, সংলাপ আর আবেগ এখনো দর্শকের হৃদয়ে বেঁচে আছে। প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি যে শিল্পভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা নতুন প্রজন্মের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে চলচ্চিত্রপ্রেমী, সহশিল্পী ও ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন এই কিংবদন্তিকে।
শেষ কথা:
কবরী শুধু একজন অভিনেত্রী ছিলেন না—তিনি ছিলেন সময়ের ভাষা, প্রেমের প্রতিচ্ছবি এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের এক চিরন্তন মুখ। তার অনুপস্থিতি বাংলা চলচ্চিত্রে এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যা পূরণ হওয়ার নয়।
“পর্দার আলো নিভে গেছে, কিন্তু কবরীর স্মৃতি এখনো জ্বলছে দর্শকের হৃদয়ে…”