
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য নাম আব্দুল জব্বার খান। তাঁর জন্মবার্ষিকী (২০ এপ্রিল) উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্মলগ্নকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে পুনরুদ্ধার করা।
জন্ম ও শৈশব:
১৯১৬ সালের ১৬ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার মাসাদগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল জব্বার খান।
শৈশব থেকেই তিনি নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্কুলজীবনে “বেহুলা”, “সোহরাব রুস্তম”সহ নানা নাটকে অভিনয় করে শিল্পমনা এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তিনি আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমান BUET) থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করেন, যা তাঁর বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল চিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
নাট্যমঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে:
চলচ্চিত্রে আসার আগে তিনি “কামলাপুর ড্রামাটিক অ্যাসোসিয়েশন” প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিয়মিত নাটক মঞ্চস্থ করতেন।
একটি ঘটনাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়—পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর মন্তব্য ছিল, “এই অঞ্চলে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়।” এই চ্যালেঞ্জই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে চলচ্চিত্র নির্মাণে।
বাংলা চলচ্চিত্রের সূচনা: মুখ ও মুখোশ
১৯৫৬ সালে তাঁর পরিচালনায় নির্মিত
মুখ ও মুখোশ — ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত প্রথম বাংলা ভাষার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে তিনি শুধু পরিচালকই নন, ছিলেন চিত্রনাট্যকার ও প্রধান অভিনেতাও। ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ৩ আগস্ট ছবিটির মুক্তি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে আছে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজ:
তার নির্মিত আরও কিছু চলচ্চিত্র—জোয়ার এলো (১৯৬২), নাচঘর (১৯৬৩, উর্দু), বাঁশরী (১৯৬৮), কাঁচ কাটা হীরা (১৯৭০), খেলাঘর (১৯৭৩) প্রভূতি। এই কাজগুলো প্রমাণ করে তিনি শুধু পথিকৃৎই নন, ধারাবাহিকভাবে চলচ্চিত্র শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একজন কারিগর।
মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা:
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রবাসী সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া তিনি “পপুলার স্টুডিও” প্রতিষ্ঠা করে দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের অবকাঠামো গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা:
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন—বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, এফডিসি সিলভার জুবিলি পদক, হীরালাল সেন স্মারক পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা প্রভৃতি।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (BFDC) লাইব্রেরি তাঁর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে—যা তাঁর প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির এক স্থায়ী নিদর্শন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার:
১৯৯৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর সৃষ্টি, সংগ্রাম এবং সাহস আজও বেঁচে আছে বাংলাদেশের প্রতিটি চলচ্চিত্রে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—সীমাবদ্ধতা নয়, সাহসই শিল্পের জন্ম দেয়।
শেষ কথা:
আব্দুল জব্বার খানের জন্মবার্ষিকী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন একদল স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য।
আজকের দিনে যখন চলচ্চিত্র শিল্প নতুন প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি, তখন তাঁর পথচলা আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণা—
“অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প।”