
পথের পাঁচালী : ৭০ বছরের যাত্রায় চলচ্চিত্র তত্ত্ব, বাস্তবতার পুনর্মূল্যায়ণ ও মানবিক অন্বেষণ
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি- ১৯৫০-এর দশকের ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাণিজ্যিক ধারা যখন অলঙ্কারিক কাহিনি, নায়ক-নায়িকার গ্ল্যামার, এবং কৃত্রিম স্টুডিও সেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, তখন সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “পথের পাঁচালী” (১৯৫৫) দিয়ে শুধু বাংলা চলচ্চিত্র নয়, পুরো বিশ্ব চলচ্চিত্রের জন্য এক নতুন ভাষা নির্মাণ করেন। আজ ২৬ আগস্টে এই চলচ্চিত্রের ৭০ বছর পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে চলচ্চিত্রটি এখনো দর্শক, গবেষক, সমালোচক এবং চলচ্চিত্র তাত্ত্বিকদের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক। ১. নব্যবাস্তবতার (Neo-Realism) অনুকরণ ও রূপান্তর “পথের পাঁচালী” অনেক সময় ইতালীয় নব্যবাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করা হয়। ভিট্টোরিও দে সিকা বা রবার্তো রোসেলিনির চলচ্চিত্র যেমন যুদ্ধোত্তর ইতালির দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও মানবিক টানাপোড়েনকে তুলে ধরেছিল, রায়ও একইভাবে বেছে নিয়েছিলেন গ্রামীণ বাংলার প্রান্তিক মানুষদের। তবে রায়ের চলচ্চিত্র কেবল নব্যবাস্তবতার অনুবাদ নয়—তিনি ভারতীয় গ্রাম্য সংস্কৃতি, প্রকৃতির তাল-লয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন এক নন্দনতত্ত্ব তৈরি করেন। গ্রামের পুকুরপাড়, বাঁশবন, পথের ধুলো, শিশুদের সরল দৌড়ঝাঁপ—সবই হয়ে ওঠে জীবনের পরিপূর্ণ ভাষা। ২. দৃষ্টিভঙ্গি ও ক্যামেরার ভাষা “পথের পাঁচালী”-তে সত্যজিৎ রায় ক্যামেরাকে ব্যবহার করেছেন পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিতে। শিশুর চোখ দিয়ে গ্রামীণ জীবনের প্রতিদিনকে ধরা হয়েছে। ক্যামেরা কখনো কৃত্রিমভাবে নাটকীয় হয় না; বরং সে “সাক্ষী” হয়ে থাকে। সুব্রত মিত্রের চিত্রগ্রহণে কাশবনের ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে ট্রেন আসার দৃশ্যটি শুধু বাংলা চলচ্চিত্রে নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রতীকী মুহূর্ত। এটি শিশুর স্বপ্ন, অজানার প্রতি আকর্ষণ এবং জীবনের অনিশ্চয়তার দার্শনিক ব্যঞ্জনা বহন করে। ৩. সঙ্গীত, শব্দ ও নীরবতার দার্শনিকতা চলচ্চিত্রটির আরেকটি বিপ্লবী দিক হলো রবীন্দ্রসংগীতের বাইরে গিয়ে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতার ব্যবহার। সেতারের টান, ঢোলক বা বেহালার সুর কাহিনির আবহ তৈরি করেছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো—নীরবতাকে রায় অর্থবহ ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। দুর্গার মৃত্যু বা দুর্বিপাকের মুহূর্তে সংলাপের চেয়ে নীরবতা অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটি চলচ্চিত্রতত্ত্বে এক নতুন ধারা উন্মোচন করে। ৪. নারীর অবস্থান ও সামাজিক বাস্তবতা “পথের পাঁচালী”-তে সর্বজয়া চরিত্রটি (করুণা ব্যানার্জি অভিনীত) গ্রামীণ নারীজীবনের প্রতীক হয়ে ওঠে। স্বামীর কর্মহীনতা, অর্থকষ্ট, সন্তানের ভবিষ্যৎ—সব বোঝা একাই বহন করতে হয় তাকে। এই নারীচরিত্র কোনো ‘নায়িকা’ নয়, বরং প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। রায়ের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে সামাজিক বাস্তবতার গভীরে প্রোথিত, যেখানে নারীর বেদনা সমগ্র মানবজীবনের বেদনার সঙ্গে মিলেমিশে যায়। ৫. ইন্দির ঠাকুরুন : বাস্তবতা, মৃত্যু ও স্বার্থকতা চলচ্চিত্রটির অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র হলো ইন্দির ঠাকুরুন (চুনিবালা দেবী অভিনীত)। বয়সে ভগ্ন, দারিদ্র্যে ক্ষতবিক্ষত এই বৃদ্ধা গ্রামীণ সমাজের আরেকটি সত্যকে সামনে আনে—প্রান্তিক বৃদ্ধ মানুষের বর্জন। সর্বজয়ার সঙ্গে তার টানাপোড়েন, ভাতের অভাব, সংসারের দায়মুক্তি তাকে প্রায় পরিত্যক্ত করে তোলে। কিন্তু অপু-দুর্গার কাছে তিনি হয়ে ওঠেন স্নেহের আশ্রয়, গল্পের ভাণ্ডার ও শৈশবের কল্পনার সঙ্গী। ইন্দির ঠাকুরুনের মৃত্যু দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের মানবতাবাদী চূড়ান্ত মুহূর্তগুলোর একটি। তাঁর নিঃসঙ্গ মৃত্যু, পথের ধারে নিথর দেহ পাওয়া—এই চিত্রকল্প যেন গ্রামীণ বাংলার অবহেলিত বৃদ্ধদের চিরন্তন নিয়তির প্রতীক। কিন্তু এখানেই তাঁর চরিত্রের স্বার্থকতা নিহিত। তিনি দর্শককে শেখান—মানুষ যতই প্রান্তিক হোক, তার জীবনেরও আছে আবেগ, স্মৃতি ও মানবিক মর্যাদা। চুনিবালা দেবীর অনবদ্য অভিনয় ইন্দির ঠাকুরুনকে কেবল চলচ্চিত্র নয়, মানবিক সাহিত্যের অমর চরিত্রে পরিণত করেছে। ৬. বিশ্বমান্যতা ও চলচ্চিত্রচর্চার ধারা প্রথমে অর্থাভাবের কারণে “পথের পাঁচালী” নির্মাণ আটকে যায় বারবার। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আংশিক অর্থায়ন করলে ছবিটি শেষ করা সম্ভব হয়। ১৯৫৫ সালে মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে “Best Human Document” পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। পরবর্তী কালে ফরাসি সমালোচক আন্দ্রে বাজাঁ, আমেরিকান পরিচালক মার্টিন স্করসেসি কিংবা জাপানি কিংবদন্তি কুরোসাওয়ারা ছবিটির শিল্পমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, একটি আঞ্চলিক গল্পও সার্বজনীন মানবিক সত্তাকে স্পর্শ করতে পারে। ৭. আজকের প্রেক্ষাপটে পুনর্পাঠ ৭০ বছর পরেও “পথের পাঁচালী” কেবল ঐতিহাসিক দলিল নয়; বরং এটি আমাদের সময়ের জন্য নতুন প্রশ্ন তোলে। দারিদ্র্য, অভিবাসন, শিক্ষার বঞ্চনা, নারীর সংগ্রাম এবং প্রবীণদের অবহেলা—এসব সমস্যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম ভিএফএক্স নির্ভর চলচ্চিত্রের ভিড়ে রায়ের এই ছবিটি মনে করিয়ে দেয়, চলচ্চিত্রের শক্তি নিহিত আছে মানবিক সত্যকে ধরা দেওয়ার ক্ষমতায়। ৮. উপসংহার “পথের পাঁচালী” শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি ভারতীয় তথা বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের ভাষাগত বিপ্লব। ৭০ বছর পরেও এটি আমাদের শেখায়—একটি সৎ দৃষ্টি, মানবিক উপলব্ধি এবং শিল্পচেতনা মিলেই চলচ্চিত্রকে কালজয়ী করে তুলতে পারে। আজকের প্রজন্মের জন্য এটি অনুপ্রেরণার পাঠ, আর গবেষকদের জন্য চলচ্চিত্রতত্ত্বের চিরন্তন ল্যাবরেটরি।